শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়িঃ হাতকড়া পরার ভয়ে কোথায় পালিয়েছেন স্বঘোষিত ‘দাবাং’ বিডিও প্রশান্ত বর্মন (Prashanta Barman)? শীতের চাদরে মোড়া উত্তরবঙ্গে সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। তিনি ভিনরাজ্যে পালিয়ে যেতে পারেন বলে আদালতে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিধাননগর পুলিশ (Bidhan Nagar Police station। তবে আদৌ তিনি ভিনরাজ্যে গা ঢাকা দিয়েছেন নাকি এরাজ্যের কোনও গোপন ঘাঁটিতে ঘাপটি মেরে বসে রয়েছেন তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে নানা মহলে। পুলিশ যা-ই বলুক না কেন, সূত্রের খবর অনুসারে, ঘন ঘন ঠিকানা বদলাচ্ছেন স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনের প্রধান আসামি। হাইকোর্টে জামিন খারিজের পর থেকে শনিবার পর্যন্ত ছয়দিনে তিনবার ডেরা বদলেছেন প্রশান্ত। গা ঢাকা দিতে ভুয়ো আধার কার্ডও তৈরি করেছেন তিনি। তদন্তকারীদের চোখে ধুলো দিতে তাঁর দপ্তরে জমা পড়া নথি দেখিয়ে বেনামে তিনটি সিম কার্ড এবং দুটি নতুন মোবাইল কিনে সেগুলির মাধ্যমেই বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছেন।
উত্তরবঙ্গের জেলায় জেলায় নামে-বেনামে থাকা প্রশান্তর সাতটি বাড়িতে ঢুঁ মেরেও তাঁর দেখা মেলেনি। কোচবিহারের খোল্টা এবং আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রামের বাড়ি ছাড়া বাকি পাঁচটি বাড়িই বেশ কয়েকদিন থেকে তালাবন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। শিলিগুড়ির শিবমন্দিরের সত্যেন বসু রোড (৩ নম্বর গলি)-এর বাড়িতে ২২ ডিসেম্বর শেষবার দেখা গিয়েছিল প্রশান্তকে। তারপর থেকেই বেপাত্তা তিনি। এদিন ওই বাড়ির গেটে তালা ঝোলানোই ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেটের উলটোদিকের গলিতে থাকা প্রশান্তর অন্য বাড়িও এদিন ছিল শুনসান। কোচবিহার শিবযজ্ঞ রোড বা হরিণচওড়ার বাড়িতে ডাকাডাকি করেও কাউকে পাওয়া যায়নি। ওই বাড়িগুলির মতোই বাইরে থেকে তালাবন্ধ ছিল আলিপুরদুয়ার-বীরপাড়া চৌপথি সংলগ্ন এলাকায় থাকা প্রশান্তর অন্য বাড়িটিও। সূত্রের খবর, ২৩ ডিসেম্বর ভোরেই শিবমন্দির ছেড়ে শিলিগুড়ি সেবক রোডে বিশাল সিনেমা হল লাগোয়া আবাসনের একটি ফ্ল্যাটে লুকিয়ে পড়েন বিডিও। সেখান থেকেই আইনি সহায়তার জন্য বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেন। সম্ভবত ২৪ ডিসেম্বর শিলিগুড়ি ছাড়েন তিনি।
সেবক রোডের যে আবাসনে লুকিয়েছিলেন বিডিও সেটি এক আমলার। সেই আমলার সঙ্গে প্রশান্তর বেশ দহরম-মহরম রয়েছে। শিবমন্দিরে বিশ্ববিদ্যালয় লাগোয়া প্রশান্তর বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল ওই আমলার। সূত্রের খবর, এরমধ্যেই আইনি পরামর্শ করতে দিল্লির বসন্তকুঞ্জ এলাকায় ওই আমলার এক আত্মীয়ের ফ্ল্যাটেও গিয়েছিলেন প্রশান্ত। সেখানে পঞ্জাবের এক আইনজীবীর সঙ্গে বৈঠকও করেন তিনি। অন্য একটি সূত্র বলছে, দিল্লি ছেড়ে ইতিমধ্যেই কলকাতায় চলে এসেছেন বিডিও। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ কলেজের কাছেই একটি হোটেলে লুকিয়ে আছেন। ওই হোটেলে বেনামে বুকিং করেছেন প্রশান্ত। বুকিংয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ভুয়ো আধার কার্ড। এদিন বহুবার চেষ্টা করেও প্রশান্তর মোবাইলে ফোন ঢোকেনি। প্রশাসনিক কর্তাদের একাংশের অনুমান, তদন্তকারীদের নজর এড়াতেই বারেবারে ডেরা বদলাচ্ছেন বিডিও।
কীভাবে দিল্লি বা কলকাতা যাতায়াত করছেন বিডিও তার খোঁজখবর শুরু করেছে বিধাননগর পুলিশের গোয়েন্দারা। পুলিশের অনুমান, বিমানে যাতায়াত করলে সহজেই ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় নীলবাতি খুলে নিজের গাড়িতেই শিলিগুড়ি থেকে কলকাতায় গিয়েছেন প্রশান্ত। তারপর সেখান থেকে ট্রেনে দিল্লি যেতে পারেন তিনি। ট্রেনের টিকিট বুকিংয়ের ক্ষেত্রেও ভুয়ো আধার কার্ড ব্যবহার করা হতে পারে। নাম ভাঁড়িয়ে তিনি বিমানে যাতায়াত করেছেন কি না তাও খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।
সূত্রের খবর, কেঁচো খুড়তে কেউটে বেড়িয়ে যেতে পারে সেই আশঙ্কায় নানা কুকর্মের প্রমাণ লোপাটের কাজও শুরু করেছেন বিডিও। খুনের অভিযোগের তদন্তে অন্য কোনও রহস্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে সেই আশঙ্কায় প্রশান্তর বিশ্বস্ত সঙ্গীরা নানা নথি নষ্ট করতে শুরু করেছেন। বিভিন্ন বাড়িতে লাগানো সিসিটিভি’র ফুটেজ মোছার কাজও শুরু হয়েছে। তদন্তে তাদের ডাক পড়তে পারে বুঝে ইতিমধ্যেই বিডিও’র কেয়ারটেকার হিসাবে যারা চিহ্নিত তাদেরও বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে কোথায় কী বলতে হবে। দক্ষ আইনজীবীদের সঙ্গে শলাপরামর্শ করেই কাজ হচ্ছে। সম্পত্তির তদন্ত হলে কীভাবে তা ম্যানেজ করা হবে তার ছকও কষতে শুরু করেছেন প্রশান্ত। তাঁকে পাকড়াও করতে ইতিমধ্যেই তাঁর কয়েকজন বিশ্বস্ত সঙ্গীর মোবাইলে আঁড়ি পেতেছে পুলিশ। তাদের দাবি, বিডিও’র গতিবিধির ওপর শুরু থেকে তাঁরা নজর রাখছিল। তা সত্ত্বেও কেন এখনও প্রশান্তকে গ্রেপ্তার করা গেল না সেই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না।
