নাগরাকাটা: বোনাসের আশানুরূপ হিসেব নিকেশের দোলাচলের মাঝেও এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি দেখা গেল মেটেলির (Matelli) ইনডং চা বাগানে (Indong tea backyard)। সরকারের নির্ধারিত ২০ শতাংশ হারে বোনাস (Bonus) বিতরণের বন্দোবস্ত করার পাশাপাশি বাগান কর্তৃপক্ষ পুজোর উপহার হিসেবে প্রত্যেক শ্রমিকের হাতে নতুন জামাকাপড় তুলে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, পাত পেড়ে খিচুড়ি ভোজ এবং শ্রমিকদের নিজস্ব পরিবেশনায় এক বর্ণালী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছিল সেখানে।
বরাবরই শ্রমিক ও মালিক পক্ষের পারস্পরিক সম্পর্ককে এক অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করার লক্ষ্যে ব্যতিক্রমী ভাবনা চিন্তা চালিয়ে যাওয়া এই বাগানটিতে এক জমজমাট উৎসবের আবহ বজায় থাকে। অনুষ্ঠান মঞ্চে উপস্থিত থেকে বাগান কর্ণধার হরিরাম গর্গ ঘোষণা করেন যে, এখন থেকে তাঁদের চা বাগান ও কর্মচারী পরিবারের কৃতি সন্তানরা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হলে কলেজের উচ্চশিক্ষার জন্য টানা তিন বছর ধরে বার্ষিক ১ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। এবারের উচ্চ মাধ্যমিকে শতকরা ৭৭ শতাংশ নম্বর অর্জনকারী বাগানেরই এক কর্মচারীর কন্যা শ্রীজিতা দত্তের হাতে এই অনুদান তুলে দেওয়ার মাধ্যমে ‘ইনডং ধ্রুবতারা’ নামক এই জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা করার কথাও তিনি ঘোষণা করেন। দেবীর বোধনের ঠিক দু’সপ্তাহ আগেই ইনডং চা বাগানের এই আয়োজন গোটা চত্বরে এক চমৎকার আবহ তৈরি করেছে।
এদিন এই উপলক্ষ্যে বাগানের ঝকঝকে শান বাঁধানো ফ্যাক্টরি চত্বরের সামনে এক এলাহি বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। কাজের শেষে কাঁচা পাতা তোলার কাজ শেষ করে সমস্ত শ্রমিকদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফ্যাক্টরির সামনে উপস্থিত হওয়ার জন্য আগেই অনুরোধ জানিয়ে রেখেছিল বাগান কর্তৃপক্ষ। তখন অবশ্য কারোরই জানা ছিল না যে তাঁদের জন্য ঠিক কী ধরনের চমক অপেক্ষা করে রয়েছে। সমস্ত শ্রমিকরা একসঙ্গে সমবেত হওয়ার পর একে একে মহিলা শ্রমিকদের নতুন শাড়ি এবং পুরুষ শ্রমিকদের জন্য শার্ট ও প্যান্ট উপহার হিসেবে তুলে দেওয়া হয়। এরপরই শুরু হয় মূল আকর্ষণ অর্থাৎ প্রীতিভোজের বর্ণময় আসর। মেনুতে রাখা হয়েছিল খিচুড়ি, পাঁচমিশালি সবজি, চাটনি এবং শেষ পাতে রসগোল্লা।
প্রায় ১,৪০০ শ্রমিক এবং তাঁদের পরিবারের সদস্য সহ মোট ১৭০০ জনেরও বেশি মানুষ এই প্রীতিভোজনের আনন্দ ভাগ করে নেন। এরপর বাগান মালিক হরিরাম বাবু ও তাঁর সহধর্মিণী সীতা গর্গের হাত থেকে ‘ইনডং ধ্রুবতারা’ প্রকল্পের ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গে পুরো চত্বরটি উপস্থিত জনতার মুহুর্মুহু হাততালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। বাগানের কর্মী সুজিত দত্তের কন্যা এই বিশেষ প্রকল্পের প্রথম বছরের জন্য মনোনীত হন। বিকেল গড়িয়ে যখন হালকা শীতের আমেজমাখা সন্ধ্যা নেমে এসেছে, তখন চা বাগানের শ্রমিকরা ধামসা ও মাদল বাজিয়ে প্রাণের আনন্দে নাচগানে মেতে ওঠেন। পাশাপাশি, ২০২৫ সালের কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে বাগানের ১০ জন পুরুষ ও ১০ জন মহিলা শ্রমিককে ‘সেরা শ্রমিক’ হিসেবে বিশেষ সম্মাননা ও পুরস্কার প্রদান করা হয়। এমনকি বাগানের সমস্ত স্টাফ ও সাব-স্টাফদের হাতেও পুজোর নানা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী উপহার হিসেবে তুলে দেওয়া হয়। ইনডং চা বাগানের ম্যানেজার রজত দেব এই প্রসঙ্গে জানান যে, তাঁদের কর্ণধার চিরকালই শ্রমিক ও মালিক পক্ষের মধ্যকার হৃদয়ের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করার পক্ষে সচেষ্ট থেকেছেন এবং আজকের এই জমকালো আয়োজন মূলত সেই দীর্ঘদিনের চিন্তাধারারই বাস্তব রূপায়ণ।
এমন অভূতপূর্ব ও ব্যতিক্রমী আয়োজন দেখে উপস্থিত বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্বও দৃশ্যতই মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। বিজেপি প্রভাবিত ভারতীয় চা ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের ইনডং ইউনিটের সভাপতি সন্তোষ ভোক্তা জানান, যে এই ধরনের উদ্যোগের ফলে তাঁদের বাগানে পুজোর আনন্দ ও উত্তেজনার পারদ কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে। অন্যদিকে, কংগ্রেস প্রভাবিত ন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ প্ল্যান্টেশন ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা তথা ইনডং থেকে পর পর পাঁচবার নির্বাচিত গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য সিনু মুন্ডা মন্তব্য করেন যে গোটা চা শিল্প জুড়ে আজ হরিরামবাবুর মতো দূরদর্শী শিল্পপতিদেরই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, যা আদতে শ্রমিক ও মালিক দুই পক্ষেরই সার্বিক কল্যাণ সুনিশ্চিত করে।

