শিলিগুড়ি: একে জিনগত বৈচিত্র্য কম। তার ওপর স্থানীয়দের পছন্দের খাবার। এই দুই কারণে অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে দার্জিলিং পাহাড়ের ‘হিমালয়ান ফ্রগ’ (Himalayan frog)। টানা তিন বছর হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে গবেষণা চালিয়ে এমন আশঙ্কাই প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা। এখন থেকে সংরক্ষণ শুরু না হলে এই ব্যাং একদিন পাহাড় থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে। তাই দ্রুত সরকারি পদক্ষেপের দাবি তুলেছেন গবেষকরা।
পাহাড়ের জীববৈচিত্র্যের অনন্য প্রতীক ‘হিমালয়ান ফ্রগ’। যার পোশাকি নাম ‘মারবেলড ক্যাসকেড ফ্রগ’ (বিজ্ঞানের ভাষায় অ্যামোলপ্স মার্মোরেটাস) হলেও দার্জিলিং ও কালিম্পং পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দাদের কাছে এই ব্যাং ‘সিসনে পা’ নামে পরিচিত। পাহাড়ি ঝরনা কিংবা পাথরের খাঁজ, মূলত আর্দ্র পরিবেশে এদের বাস। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, দার্জিলিং কলেজ, তাম্রলিপ্ত কলেজ এবং জুলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার (জেডএসআই) মোট ১২ জন বিজ্ঞানী টানা প্রায় তিন বছর দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্সিয়াং, মিরিক, ঘুম, সান্দাকফুর মতো পাহাড়ের ৫৭টি গন্তব্য ঘুরে ‘হিমালয়ান ফ্রগ’-এর নমুনা সংগ্রহ করেন। ২০০ থেকে ২৪০০ মিটার উচ্চতায় বিভিন্ন জলপ্রপাত, পাহাড়ি নদীর ধারে সমীক্ষা চলে। মোট ৬০টি ব্যাঙের দেখা পেয়েছিল গবেষকদল। তার মধ্যে ৩৫টির ডিএনএ বিশ্লেষণ করা হয়। জেডএসআই-এর বিজ্ঞানী কৌশিক দেউতি এই প্রজাতির পরিচয় নিশ্চিত করেন। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল ‘বিএমসি জেনোমিক্স’-এ প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানীদের গবেষণাপত্রটি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক রাকেশ তামাং গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। নমুনা পরীক্ষার জন্য ১৬ এস আরএনএ এবং সিওআই এই দুটি জিন ব্যবহার করা হয়েছিল। রাকেশ বলেন, ‘এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে এই ব্যাং পাওয়া গেলেও দার্জিলিং (Darjeeling) সংলগ্ন পার্বত্য অঞ্চলের প্রজাতি জিনগতভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। মায়ানমার, চিন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃষ্টি অরণ্যের প্রান্তে এই ব্যাং পাওয়া যায়। যদিও তাদের শরীরে জিনগত বৈচিত্র্য অনেক বেশি।’ ওই গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, জিনগত বৈচিত্র্য কম থাকায় ‘হিমালয়ান ফ্রগ’-এর বিলুপ্তির সম্ভাবনা অনেক বেশি। প্রাকৃতিক এবং জলবায়ুগত পরিবর্তন, উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারায় এই ব্যাং বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কিন্তু কেন এই সংকট? বিজ্ঞানের ভাষায়, কোনও প্রাণীর বংশবৃদ্ধির ক্ষেত্রে জিনগত বৈচিত্র্য থাকা অত্যন্ত জরুরি। যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। কিন্তু গত ২০-২৫ বছরে যথেচ্ছভাবে পাহাড়ে পর্যটন বিকাশের লক্ষ্যে হোটেল, হোমস্টে তৈরি হয়েছে। ফলে ব্যাংগুলি গভীর জঙ্গলে যাচ্ছে। সেখানে সাপের সংখ্যা বেশি। ফলে ব্যাং বাঁচতে পারছে না। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কুমারেশ মণ্ডলের দাবি, প্রোটিনে ভরপুর এই ব্যাং পাহাড়ে খাওয়ার রীতি রয়েছে। ফলে শিকারের জেরে এই বৈচিত্র্য কমেছে। তিনি বলেন, ‘ব্যাংটিকে রক্ষা করতে মানুষকে সচেতন করতে হবে।’
পাশাপাশি ডিএনএ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা এই বিশেষ ধরনের ব্যাঙের বিবর্তনের সময়কাল বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন। এশিয়ায় এই প্রজাতির পূর্বপুরুষদের বাস ছিল প্রায় ১.৭৪ কোটি বছর আগে। দক্ষিণ এশিয়ায় এদের বংশ প্রায় এক কোটি বছর আগে আলাদা হয়ে গিয়েছে। দার্জিলিংয়ে মারবেলড ক্যাসকেড ব্যাঙের বংশ প্রায় ৯.৪০ লক্ষ বছর আগে ছড়িয়েছিল।

