শারদোৎসবের চার দিন সোনাঝুরির হস্তশিল্পীদের হাটে বসে না পসরা। পর্যটকদের আনাগোনা আর হস্তশিল্পের বেচাকেনার চেনা ছবির বদলে শাল-পিয়ালের জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়ে অন্য এক উৎসবের আবহ। বুনোফুলের গন্ধ মাখা বাতাসে ভেসে আসে মাদলের দ্রিমি দ্রিমি বোল। তাল মিলিয়ে হয় আদিবাসী নৃত্য। স্থানীয় আদিবাসী গ্রাম বল্লভপুরডাঙা, ফুলডাঙা, সরকারডাঙা, বোনের পুকুরডাঙা-সহ পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের কাছে এই উৎসব শুধু দুর্গাপুজো নয়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মিলনোৎসব। শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরির দুর্গাপুজো, অর্থাৎ হীরালিনী দুর্গোৎসব, এভাবেই স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছে।
এখানে পুজোর প্রধান পরিচয় আড়ম্বর নয়। আদিবাসী জনজীবনের সঙ্গে উৎসবের নিবিড় সংযোগ। সাঁওতাল পরিবারগুলিই পুজোর নানা দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন। চারদিন ধরে চলে তাঁদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দুর্গাপুজোর আঙিনায় মিশে যায় আদিবাসীদের বেলবরণ উৎসব ও দশাই নৃত্য। মাদলের ছন্দে, নাচের তালে আর সম্মিলিত অংশগ্রহণে এই উৎসব যেন হয়ে ওঠে প্রকৃতির কোলে আদিবাসী সংস্কৃতির আকর্ষণ।
আরও পড়ুন:
পুজোর প্রতিমাতেও রয়েছে এক ব্যতিক্রমী ভাবনা। দেবী এখানে দশভূজা, কিন্তু তাঁর হাতে নেই প্রচলিত অস্ত্রশস্ত্র। দশ হাতে শোভা পায় দশটি পদ্মফুলের কুঁড়ি। হিংসার পরিবর্তে শান্তি, সংঘাতের বদলে সম্প্রীতি এবং প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধার বার্তা বহন করে এই পদ্ম। প্রচলিত দুর্গাপ্রতিমার পরিচিত রূপকে শিল্পের ভাবনায় সাজিয়েছিলেন প্রয়াত শিল্পী বাঁধন দাস। বিশ্বশান্তির বার্তা দিতেই তিনি দেবীর হাতে অস্ত্রের বদলে পদ্মফুল তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর সেই ভাবনা আজও অক্ষুণ্ণ।
২০০১ সালে শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরি জঙ্গলে এই শৈল্পিক দুর্গোৎসবের সূচনা করেন বাঁধন দাস। তাঁর প্রয়াণের পর উৎসবের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তাঁর ছাত্র, শিল্পী আশিস ঘোষ। দেখতে দেখতে ২৬ বছরে পা দিয়েছে এই পুজো। এবার প্রতিমা তৈরি হয়েছে ফাইবার দিয়েই। প্রতিমার শিল্পিত রূপ আর জঙ্গলের স্বাভাবিক সৌন্দর্য মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য পরিবেশ। ঝলমলে আলোকসজ্জা, চোখধাঁধানো মণ্ডপ কিংবা জাঁকজমকের প্রতিযোগিতা এখানে নেই। প্রকৃতিকে অক্ষত রেখে শিল্পের মধ্য দিয়ে উৎসবকে আপন করে নেওয়াই এই পুজোর বিশেষত্ব। আদিবাসী মানুষের অংশগ্রহণই এই দুর্গোৎসবের প্রাণ। এখানে তাঁদের ভূমিকা কেবল দর্শক কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিবেশক হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। পুজোর আয়োজন থেকে উৎসবের নানা কর্মসূচিতেই রয়েছে তাঁদের সক্রিয় উপস্থিতি। বেলবরণ ও দশাই নৃত্যের মতো নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরম্পরা দুর্গোৎসবের সঙ্গে মিলেমিশে যায় দুই ভিন্ন ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিসর।
শিল্পী আশিস ঘোষ বলেন, “আমার মাস্টারমশাই শিল্পী বাঁধন দাসের হাত ধরেই উৎসবের সূচনা হয়েছিল। সেই সময় থেকেই স্থানীয় আদিবাসী মানুষদের সঙ্গে নিয়েই পুজো হয়ে আসছে। পুজোর চার দিন তাঁরাই নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এই সময় আদিবাসীদের বেলবরণ উৎসবও হয়। আমরাও সেই উৎসব একসঙ্গে উদ্যাপন করি।” শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরির এই দুর্গোৎসব তাই নিছকই দুর্গাপুজো নয়। মাদলের তালে, নৃত্যের ছন্দে আর মানুষের মিলিত উদ্যাপনে দেবীর আরাধনা ছড়িয়ে পড়ে জঙ্গলের পথে পথে। সোনাঝুরির হীরালিনী দুর্গোৎসব মনে করিয়ে দেয়, উৎসবের সৌন্দর্য মানুষের সংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও সম্মিলিত অংশগ্রহণেই।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
