Gangarampur | ‘মানুষের সেবা করাই স্বপ্ন’, অভাবকে হারিয়ে নিট-এ নজরকাড়া সাফল্য গঙ্গারামপুরের প্রিয়ব্রতর

Gangarampur | ‘মানুষের সেবা করাই স্বপ্ন’, অভাবকে হারিয়ে নিট-এ নজরকাড়া সাফল্য গঙ্গারামপুরের প্রিয়ব্রতর

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


গঙ্গারামপুর: অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং বাবা-মায়ের অক্লান্ত ত্যাগ, এই তিনের মিলিত শক্তিই যে জীবনের সবচেয়ে বড় পুঁজি, তা আবারও প্রমাণ করে দিল দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর (Gangarampur) ব্লকের বেলবাড়ি (২) গ্রাম পঞ্চায়েতের ঠেঙ্গাপাড়া–বোয়ালদহ গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকার মেধাবী ছাত্র প্রিয়ব্রত সরকার। চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও ২০২৬ সালের NEET (UG) পরীক্ষায় অসাধারণ সাফল্য অর্জন করে সে শুধু নিজের পরিবার নয়, গর্বিত করেছে সমগ্র দক্ষিণ দিনাজপুর জেলাকে।

ঠেঙ্গাপাড়া উচ্চবিদ্যালয় (Thangapara Excessive College) থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা ছাত্র প্রিয়ব্রত সরকার NEET(UG) সর্বভারতীয় মেধাতালিকায় ৭৮৪তম স্থান, ওবিসি বিভাগে ২৩৭তম স্থান এবং ৬৬৩ নম্বর পেয়ে জেলার সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত পরীক্ষার্থী হিসেবে নজির গড়েছে। তার এই অসামান্য কৃতিত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে রাজ্য সরকারও। পশ্চিমবঙ্গের সেরা ১০০ জন কৃতী ছাত্রছাত্রীর তালিকায় স্থান পেয়েছে সে। আগামী মঙ্গলবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর হাত থেকে সংবর্ধনা গ্রহণ করবে প্রিয়ব্রত। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে তাকে একটি ল্যাপটপ উপহার দেওয়া হবে। ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনের তরফে তাঁর পরিবারের কাছে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে গিয়েছে। এর পাশাপাশি তাঁর কলকাতায় যাতায়াতের সমস্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

তবে এই সাফল্যের পথ মোটেও সহজ ছিল না। প্রিয়ব্রতের বাবা প্রেমানন্দ সরকার একসময় নিজের তাঁতে কাপড় বুনে সংসার চালাতেন। কিন্তু করোনা মহামারির পর সেই কাজ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে অন্যের তাঁতের তানা তৈরির কাজ পেলেই সংসার চলে, আর কাজ না থাকলে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট বাড়িতে অভাব-অনটনের মধ্যেই দিন কাটলেও, ছেলের পড়াশোনার ক্ষেত্রে কোনও আপস করেননি বাবা-মা। নিজেদের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে ছেলের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তাঁরা।

নিজের সাফল্য নিয়ে আবেগাপ্লুত প্রিয়ব্রত জানায়, “আমার এই ফলাফলে আমি ভীষণ খুশি। এত ভালো র‌্যাঙ্ক হবে, সত্যিই ভাবিনি। আমার এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার শিক্ষকদের এবং বাবা-মায়ের। তাঁদের কাছে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ। এই দীর্ঘ যাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত আমি উপভোগ করেছি। গতকাল জানতে পেরেছি, মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের সেরা ১০০ জন ছাত্রছাত্রীকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য নির্বাচন করেছেন। তাঁদের মধ্যে আমি রয়েছি—এটা আমার কাছে অত্যন্ত গর্বের। আমার যাত্রা এখনই শুরু। ভবিষ্যতে কোন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হব, তা এখনও ঠিক করিনি। তবে একজন ভালো চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করাই আমার স্বপ্ন।”

ছেলের সাফল্যে গর্বিত বাবা প্রেমানন্দ সরকার বলেন, “ছোটবেলা থেকেই ওর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল। সংসারে অভাব থাকলেও সেই স্বপ্ন কখনও ভেঙে যেতে দিইনি। বাবা-মায়ের ত্যাগ আর শিক্ষকদের সহযোগিতাতেই আজ ও এই জায়গায় পৌঁছেছে।”

আবেগঘন কণ্ঠে প্রিয়ব্রতর মা শিল্পী সরকার বলেন, “অভাবের সংসারে অনেক কষ্ট করে ছেলেকে পড়িয়েছি। কখনও ভাবিনি ও এত বড় সাফল্য অর্জন করবে। দিনের পর দিন পড়াশোনা করেছে, নিজের কোনও চাহিদার কথা বলেনি। আজ ওর সাফল্যে আমাদের সব কষ্ট সার্থক হয়েছে। ঈশ্বর যেন ওকে আরও বড় মানুষ তৈরি করেন।”

স্থানীয় বাসিন্দা সুব্রত সরকারের কথায়, “প্রিয়ব্রত অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র ও পরিশ্রমী ছেলে। এত দারিদ্র্যের মধ্যেও যেভাবে এই সাফল্য অর্জন করেছে, তা শুধু আমাদের গ্রামের নয়, গোটা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গর্ব। ওর এই সাফল্য আগামী প্রজন্মকে বড় স্বপ্ন দেখতে এবং কঠোর পরিশ্রম করতে অনুপ্রাণিত করবে।”

প্রিয়ব্রতের এই সাফল্যে বোয়ালদহ গ্রাম থেকে শুরু করে গোটা দক্ষিণ দিনাজপুর জুড়েই এখন আনন্দের আবহ। শিক্ষা মহলের মতে, অর্থের অভাব কখনও মেধা ও অধ্যবসায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। প্রিয়ব্রত সরকার সেই সত্যেরই জীবন্ত উদাহরণ।

প্রত্যন্ত গ্রামের একটি সাধারণ ঘর থেকে নবান্নের মঞ্চে পৌঁছে যাওয়ার এই যাত্রা প্রমাণ করে, স্বপ্ন যদি বড় হয়, পরিশ্রম যদি অবিচল থাকে এবং পরিবারের ভালোবাসা যদি পাশে থাকে, তবে কোনও প্রতিকূলতাই সাফল্যের পথ আটকে রাখতে পারে না। মঙ্গলবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর হাত থেকে সংবর্ধনা গ্রহণের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ দিনাজপুরের এই কৃতী ছাত্রের সাফল্যের মুকুটে যুক্ত হতে চলেছে আরও এক গৌরবময় অধ্যায়।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *