মৈত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায়, লস অ্যাঞ্জেলেস: সিলিকন ভ্যালিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) নিয়ে কাজ করার সুবাদে প্রতিদিন নিত্যনতুন প্রযুক্তির সঙ্গে আমার ওঠাবসা। কিন্তু সেই প্রযুক্তি যখন আমার প্রিয় খেলা ফুটবলের (FIFA World Cup 2026) একেবারে হৃৎপিণ্ডে মানে বিশ্বকাপের বলে ঢুকে পড়ে, তখন একজন এআই ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে রোমাঞ্চটা দ্বিগুণ হয়ে যায়। ভাবুন তো, ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দের ওয়ার্মআপ করতে দেখাটা স্বাভাবিক, কিন্তু স্মার্টফোনের মতো ফুটবলকেও এখন চার্জ দিতে হচ্ছে! হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন। এবারের বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল ‘ট্রিওন্ডা’ আদতে চামড়ায় মোড়া এক অত্যাধুনিক ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেট। নব্বই মিনিট চার্জ দিলে তবেই টানা ছ’ঘণ্টা মাঠে দৌড়োতে প্রস্তুত এই স্মার্ট বল।
১৯৭০ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে অ্যাডিডাসের তৈরি সাদা-কালো রঙের ৩২ প্যানেলের ‘টেলস্টার’ বলের কথা আমরা সবাই জানি। সাদা-কালো টিভির যুগে দর্শকদের সুবিধার জন্যই ছিল ওই নকশা। কিন্তু আজকের যুগটা এআই-এর। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপের বলও হয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ‘আল রিহলা’ বলের মধ্যে দিয়ে যে সেন্সরের ব্যবহার শুরু হয়েছিল, ট্রিওন্ডায় তা পৌঁছেছে এক অনন্য মাত্রায়। এর চারটির মধ্যে একটি প্যানেলের ঠিক কেন্দ্রে বসানো রয়েছে ৫০০ হার্জের একটি ‘ইনার্সিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট’ বা আইএমইউ মোশন সেন্সর। বলের ফ্লাইট যাতে ঠিক থাকে, তার জন্য বাকি প্যানেলগুলোতে নিখুঁত কাউন্টারব্যালেন্স করা হয়েছে।
প্রযুক্তির একজন ছাত্রী হিসেবে আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে এই সেন্সরের কাজ করার ধরন। এটি প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার সিগন্যাল পাঠায় স্টেডিয়ামের চারপাশে বসানো অ্যাঙ্কার পয়েন্টগুলোতে। বলের দিক, গতি, স্পিন- সবকিছুর ডেটা রিয়েল-টাইমে প্রসেস হয়। এর সঙ্গে মাঠের সেন্সরগুলো খেলোয়াড়দের মুভমেন্ট ট্র্যাক করে। ফলে এআই-এর সাহায্যে অফসাইড, হ্যান্ডবল বা সূক্ষ্ম ফাউলের ক্ষেত্রে দ্রুত এবং একেবারে নির্ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। ফুটবলে ভিএআর আসার পর সিদ্ধান্ত নিতে যে অতিরিক্ত সময় নষ্ট হত, এই ডেটানির্ভর প্রযুক্তির জেরে তা অনেকটাই কমবে বলে আমার বিশ্বাস।
অনেকের হয়তো ২০১০ সালের কুখ্যাত ‘জাবুলানি’ বলের কথা মনে পড়বে, যার অপ্রত্যাশিত গতির কারণে গোলকিপাররা রীতিমতো আতঙ্কে ভুগতেন। ট্রিওন্ডার নকশাও অনেকটা জাবুলানির মতোই টেট্রাহেড্রন বা চারটি ত্রিভুজ দিয়ে তৈরি। কিন্তু জাবুলানির মতো এটি মসৃণ নয়। হাওয়ায় গতির ভারসাম্য যাতে নষ্ট না হয়, তার জন্য ট্রিওন্ডার উপরিভাগে ইচ্ছে করেই তিনটি গভীর খাঁজ এবং গলফ বলের মতো মাইক্রোটেক্সচার রাখা হয়েছে। অধ্যাপক জন এরিক গফের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানীর গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সজোরে মারা একটি দূরপাল্লার শট প্রত্যাশিত দূরত্বের চেয়ে কয়েক মিটার আগেই মাটিতে ড্রপ খেতে পারে। যদিও এটি ল্যাবরেটরির স্পিন হীন অবস্থার পরীক্ষা, তাই আসল ম্যাচের পরিবেশের ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করবে।
যেহেতু এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো মিলে এই টুর্নামেন্ট আয়োজন করছে, তাই ট্রিওন্ডার ডিজাইনেও এই তিন দেশের সুস্পষ্ট ছোঁয়া থাকছে। সাদা বেসের ওপর লাল, নীল এবং সবুজ রঙের গ্রাফিকসের পাশাপাশি কানাডার ম্যাপেল পাতা, মেক্সিকোর ইগল এবং যুক্তরাষ্ট্রের তারার ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছে এই বলটিকে। সিলিকন ভ্যালির কর্পোরেট ল্যাবে বসে আমরা যে ডেটা আর এআই বিপ্লবের কথা দিনরাত চর্চা করি, তা এবার এভাবেই সরাসরি শাসন করবে বিশ্বকাপের মাঠকে!
