জয় মণ্ডল, নিউ ইয়র্ক: টাইমস স্কোয়ারের সাবওয়ে স্টেশন থেকে বেরোতেই সবার আগে চোখ আটকে যাবে একটা পেল্লায় বিলবোর্ডে। তিনতলা সমান উঁচু সেই ফ্লেক্সে কিলিয়ান এমবাপে আর ভিনিসিয়াস জুনিয়ারের মুখ! কলম্বাস সার্কেলের শপিং মলে বসেছে প্রায় দশ ফুট উঁচু একটা কাউন্ট ডাউন ক্লক। আর এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং সেজে উঠেছে তিন আয়োজক দেশের পতাকার রঙে- আমেরিকার লাল-সাদা-নীল, কানাডার লাল-সাদা আর মেক্সিকোর সবুজ-সাদা-লাল। কালই কিক-অফ (FIFA World Cup 2026)।
বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর থেকে সাইকেলে চেপে যখন দুনিয়া ঘুরতে বেরিয়েছিলাম, তখন ফুটবল নিয়ে আমেরিকার মানুষের মধ্যে এতটুকুও হেলদোল ছিল না। কিন্তু আজ মেজর লিগ সকারের কমিশনার ডন গার্বারের ভাষায় এই দেশটাই হয়ে উঠেছে ‘বিশ্ব ফুটবলের এটিএম’।
নিউ ইয়র্ক শহরের একটা অদ্ভুত জাদুকরী ক্ষমতা আছে। গোটা বিশ্বের মনোযোগকে সে স্পঞ্জের মতো শুষে নিয়ে এমন একটা উৎসবের আবহ তৈরি করে, যেন সবকিছু এই শহরের জন্যই তৈরি হয়েছে। টাইমস স্কোয়ার থেকে মাত্র কয়েক ব্লক হাঁটলেই ‘লিটল ব্রাজিল’, যেখানে প্রায় এক লাখ ব্রাজিলীয়র বাস। একটু উত্তরে গেলেই শুনতে পাবেন ঘানার আক্রা শহরের স্পন্দন। লোয়ার ইস্ট সাইডে জার্মানদের ভিড়, আর কুইন্সের রুজভেল্ট অ্যাভিনিউ তো মনে হয় যেন আস্ত একটা ইকুয়েডর। ইউএস ন্যাশনাল টিমের সমর্থক গোষ্ঠী ‘আমেরিকান আউটলজ’-এর সদস্য নাথান জোনসের কথায়, ‘আগে মানুষ শুধু নিজেদের শেকড়ের দেশকেই সমর্থন করত, কিন্তু এখন সেই ধারণায় বদল আসছে।’
অথচ, সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিটা হল, যারা কাল থেকে এই শহরের রাস্তায় রাস্তায় নিজেদের দেশের পতাকা ওড়াবে, নানা ভাষায় গান গাইবে, রুজভেল্ট অ্যাভিনিউয়ের পাবগুলোকে পালটে দেবে এক টুকরো কুইটোতে- এই দেশের বর্তমান প্রশাসন গত দেড় বছর ধরে সেই অভিবাসীদেরই দেশছাড়া করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে!
আমেরিকার বর্তমান প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি এবং ট্র্যাভেল ব্যানের জেরে এবার সেনেগাল, আইভরি কোস্ট, ইরাক বা হাইতির মতো যোগ্যতা অর্জনকারী দেশের সাধারণ সমর্থকরা মাঠে বসে খেলা দেখার সুযোগ থেকে কার্যত বঞ্চিত হচ্ছেন। যাঁরা ইতিমধ্যেই আমেরিকায় আছেন, তাঁদের মধ্যেও এক অদ্ভুত আতঙ্ক কাজ করছে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি স্পষ্ট জানিয়েছে, গ্যালারির আশপাশে এবং স্টেডিয়াম চত্বরে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা ‘আইস’ আধিকারিকরা টহল দেবেন। গত বছর মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা দেখার সময় খোদ গ্যালারি থেকে এক ব্যক্তিকে আটক করে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। ফলে ম্যাসাচুসেটসের ফক্সবোরোতে হাইতির প্রচুর অভিবাসী বসবাস করলেও, তাঁরা স্টেডিয়ামমুখো হতে ভয় পাচ্ছেন। লস অ্যাঞ্জেলসের সোফাই স্টেডিয়ামের কর্মীরা ইমিগ্রেশন দপ্তরের ধরপাকড় থেকে নিজেদের সুরক্ষার দাবিতে ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছেন। ডালাসে অভিবাসীদের মধ্যে আপৎকালীন আইনি অধিকারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ংকর খবর হল, কানসাস সিটিতে বিশ্বকাপের পর্যটকদের স্বাগত জানানোর পাশাপাশি ২৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করে একটি নতুন জেলখানা বানানো হয়েছে। যে সংস্থা এই জেল বানিয়েছে, তারাই একসময় গুয়ান্তানামো বে-র কুখ্যাত খাঁচাগুলো নির্মাণ করেছিল।
ফুটবলের এই বিশ্বজনীন উৎসবের সঙ্গে আয়োজক দেশের কড়া অভিবাসন নীতির এক চরম বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘আমেরিকার প্রথম সকার প্রেসিডেন্ট’ আখ্যা দিয়ে খোদ ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো তাঁর হাতে তুলে দিচ্ছেন ফিফার প্রথম ‘পিস প্রাইজ’। অথচ বাস্তবের মাটিতে প্রায় একডজন যোগ্যতা অর্জনকারী দেশের সাধারণ সমর্থকরা ভিসা না পেয়ে মাঠে বসে খেলা দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ইরানের সঙ্গে আমেরিকার চরম টানাপোড়েন, ইরাকের সঙ্গে শীতল সম্পর্ক- সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত ভূ-রাজনৈতিক জট।
মাঠ এবং মাঠের বাইরের নিরাপত্তাও এবার রীতিমতো ভয় ধরানোর মতো। আকাশে চক্কর কাটছে হান্টার ড্রোন, রাস্তায় ঘুরছে রোবট ডগ, এক্স-রে ট্রাক এবং এআই ক্যামেরা দিয়ে চলছে অবিরাম নজরদারি।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের সময় আয়োজকরা ভেবেছিলেন, আমেরিকানরা আদৌ এই টুর্নামেন্ট গ্রহণ করবে কি না। কিন্তু এবারের ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। আমেরিকা এখন এই খেলাটা বোঝে এবং এর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চায়। কিন্তু তারা কি ফুটবলের আসল আবেগটাকে নিজেদের অস্থিমজ্জায় ধারণ করতে পারবে? আগামী ৪১ দিনে এই প্রশ্নটারই উত্তর খুঁজব আমরা।
শহরের বিলবোর্ডগুলো আলো ছড়াচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই চাকচিক্যের ঠিক নীচেই ঘাপটি মেরে আছে এক গভীর উদ্বেগ।
