সানি সরকার, শিলিগুড়ি: ট্রেনের চাকা থামিয়ে দিল ইঁদুর! শুনতে অবিশ্বাস্য হলেও ফরাক্কা-ধুলিয়ানের রেলপথে ধসের নেপথ্যে (Farakka Railway Observe Landslide) এখন সেই ছোট্ট প্রাণীই রেলের সন্দেহের কেন্দ্রে।
গণেশ চতুর্থীর আগে সিদ্ধিদাতার বাহনের কারসাজিতে মাটির গভীরে তৈরি হওয়া গর্ত এবং তাতে বৃষ্টির জল ঢুকে পড়াতেই বিপর্যয় ঘটেছে ফরাক্কায়, সে ব্যাপারে অনেকটা নিশ্চিত রেলকর্তারা। শুধু বাংলার মাটিতে নয়, বৃহস্পতিবার ধস নেমেছে অসমের জামিরা এবং মিজোরামের ভৈরবীর মাঝেও। এখানে ভারী বৃষ্টি হলেও ধসের মূলে সেই ইঁদুর। যথারীতি পূর্ব রেলের পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলেও বিপর্যস্ত পরিষেবা। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং নতুন করে ট্রেনের চাকা গড়াবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। রবিবার থেকে অবশ্য পরিষেবা স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন পূর্ব রেলের কর্তারা। তবে শনিবার ডাউন লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকলেও, আপ লাইনে ট্রেনের চাকা গড়াবে। অর্থাৎ উত্তরবঙ্গগামী ট্রেনগুলি চলবে।
ইঁদুরের কারণে মূল বিপর্যয় ঘটলেও ঘটনার দায় এড়াতে পারছে না রেল। ফরাক্কা স্টেশন কেবিন থেকে ধুলিয়ানের মধ্যে আটশো মিটার এলাকায় যেভাবে ধস নেমেছে, তা যে হঠাৎ হয়নি, তা একপ্রকার নিশ্চিত। ফলে রেলের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সাধারণত প্রাক বর্ষার সময় থেকেই রেললাইনে বর্ষাকালীন নজরদারি চলার কথা। তা চললে, কেন বিপর্যয়ের আগাম আঁচ পাওয়া গেল না?
রেলেরই একটি সূত্রে খবর, ফরাক্কা স্টেশন কেবিন ও ধুলিয়ানের মধ্যে রেললাইনের নীচের যে অংশে ধস নেমেছে, তা ক্ষয়ে গিয়েছে গভীর থেকেই। মূলত ইঁদুর একাধিক গর্ত সৃষ্টি করায় এবং তাতে বৃষ্টির জল ঢুকে পড়ায় এমন বিপর্যয় ঘটেছে। ইঁদুরের গর্ত নিশ্চিত হওয়ায় প্রথমে স্টোনডাস্ট ফেলে মুখ বন্ধ এবং ট্র্যাকের জমি মেরামতের চেষ্টা করেছিল রেল। কিন্তু ওই চেষ্টা কাজে লাগেনি। যে কারণে বোল্ডার ফেলে এবং গার্ডওয়ালের মধ্যে গিয়ে মাটি ধরে রাখার ওপর নজর দেওয়া হয়েছে। সঠিক নজরদারি থাকলে এবং আগাম গার্ডওয়ালের ব্যবস্থা করা হলে এধরনের বিপর্যয় এড়ানো যেত বলে মনে করছেন রেলকর্মীদের একটা বড় অংশ। এদিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পূর্ব রেলের জেনারেল ম্যানেজার গীতিকা পান্ডে। বিপর্যয়ের মূলে ইঁদুর কি না, তা তাঁরা খতিয়ে দেখছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর নির্দেশে মাটি পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
কেন রেললাইনের ধারে এত ইঁদুরের উৎপাত? রেলকর্মীরা বলছেন, রেললাইন মানে শুধু ট্রেনের যাতায়াত নয়। অনেক জায়গায় ইঁদুরের কাছেও তা দিব্যি ‘আবাসন প্রকল্প’। দু’ধারে উচ্ছিষ্ট, প্যাকেট ও জমে থাকা আবর্জনা। তার পাশেই ঝোপঝাড়, নরম মাটি, নিকাশিনালা কিংবা ফাঁকা জায়গা। সব মিলিয়ে ইঁদুরের বংশবিস্তারের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয় রেললাইনের আশপাশে। বিশেষ করে স্টেশন, লেভেল ক্রসিং, ট্রেন থামার জায়গা এবং জনবহুল অংশে সমস্যা আরও বেশি। ট্রেন থেকে যাত্রীরা খাবারের প্যাকেট, বিস্কুট, ফলের খোসা, ভাত-তরকারির আবর্জনা ফেলে দেন লাইনের ধারে। কোথাও আবার খাবারের দোকান বা হকারদের বর্জ্যও জমে থাকে। নিয়মিত সাফাই না হলে সেই উচ্ছিষ্টই ইঁদুরের নিত্যদিনের খাবারের জোগান হয়ে দাঁড়ায়।
খাবারের পাশাপাশি রেললাইনের নীচের মাটিও তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়। মাটি নরম হলে গর্ত করা সহজ। এক গর্ত থেকে আরেক গর্ত, এ ভাবেই মাটির নীচে তৈরি হয় সুড়ঙ্গের জাল। বাইরে থেকে যার অস্তিত্ব বোঝার উপায় নেই। সমস্যা আরও বাড়ে বর্ষায়। সেই গর্তে বৃষ্টির জল ঢুকে মাটি ধুয়ে বা সরিয়ে দিলে রেললাইনের নীচের জমি ফাঁপা হয়ে যেতে পারে। ফলে শুধু ফরাক্কা নয়, আগামীতে আরও একাধিক জায়গায় এমন বিপর্যয় ঘটতে পারে।
রেলকর্তাদের মতে, নিয়মিত ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ, উচ্ছিষ্ট দ্রুত সরানো এবং লাইনের দু’ধারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি। কারণ, ছোট্ট গর্ত চোখে না পড়লেও তার ফল যে কত বড় হতে পারে, ফরাক্কার ধসই তার বড় উদাহরণ।

