কল্লোল মজুমদার, মালদা: দূরত্বের হিসাবে শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয়, মালদা (Malda) শহরের গা ঘেঁষেই রয়েছে আমজামতলা। অথচ দুর্গাপুজোর (Durga Puja 2026) আবহের দিক দিয়ে যেন দুই আলাদা জগৎ। শহরের রাস্তায় যখন পুজোর কেনাকাটার ভিড়, মণ্ডপে শেষমুহূর্তের প্রস্তুতি, কোথাও প্রতিমা এসে গিয়েছে, কোথাও আবার শিল্পীরা ব্যস্ত কাপড় লাগানো কিংবা সাজসজ্জার কাজে— তখন আমজামতলায় পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু উৎসাহের সেই চেনা উচ্ছ্বাস এখনও চোখে পড়ছে না। এলাকার কয়েক কিলোমিটারের রাস্তায় গোটা তিনেক দুর্গাপুজো। কোথাও রাস্তার ধারে পড়ে রয়েছে বাঁশ। এখনও মণ্ডপের কাঠামো তৈরি হয়নি। কোথাও আবার পাকা মণ্ডপ রয়েছে ঠিকই, কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজই শুরু হয়নি। শহরের মণ্ডপে যখন সাজসজ্জার কাপড় লাগতে শুরু করেছে, তখন আমজামতলায় অনেক পুজোর প্রস্তুতি যেন এখনও ‘সময় আছে’ ভাবনাতেই আটকে।
গ্রামের একটি দোকানের সামনে বসেছিলেন বয়স্ক পরিতোষ সাহা। পুজোর কথা উঠতেই তিনি বললেন, ‘আমজামতলায় গোটা তিনেক পুজো হয়। ওই যে মন্দিরটা দেখছেন, ওখানে পুজো হয়। তার আগে একটা, পরেও একটা পুজো হয়।’ ‘পুজো এসে গেল, এখানে কেন এমন নিরুৎসাহ?’—প্রশ্ন শুনে এলাকার বাসিন্দা রমেশ রায়ের সোজাসাপ্টা উত্তর, ‘এখনও তো অনেকদিন বাকি। এখন যে যার কাজে ব্যস্ত। মহালয়ার পরে এলে দেখতে পাবেন পুজোর কাজ। আমরা তো গ্রামে থাকি। গ্রামের পুজো শহরের মতো জাঁকজমকপূর্ণ হয় না।’
আমজামতলা গ্রামের মাঝখানে রয়েছে একটি পুরোনো দুর্গামণ্ডপ। প্রতিবছর সেখানেই পুজো হয়। এখন মন্দিরের সামনে পড়ে রয়েছে বেশ কিছু বাঁশ। সামনের একটি বাড়ির দেওয়ালে ঝুলছে ‘আমজামতলা সোনালি ক্লাব’-এর ব্যানার। কিন্তু সেখানে নেই কোনও উদ্যোক্তার ব্যস্ততা, নেই শ্রমিকের ছোটাছুটি। আমজামতলায় পুজো আসে একেবারে অন্য ছন্দে। এখানকার বহু মানুষ দিনমজুরি, ছোট ব্যবসা কিংবা নানা কাজের সঙ্গে যুক্ত। ফলে পুজোর প্রস্তুতির জন্য আলাদা করে সময় বের করা সহজ নয়। অর্থের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তাই শহরের মতো বড় বাজেট, থিম, আলোকসজ্জা কিংবা প্রচারের প্রতিযোগিতা নেই। এখানে পুজো অনেক বেশি স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল।
তবে তাই বলে উৎসবের আনন্দ নেই, এমনটাও নয়। গ্রামবাসীদের কথায়, মহালয়ার পর থেকেই বদলে যাবে ছবিটা। তখন বাঁশের কাঠামো উঠবে, মণ্ডপ পরিষ্কার হবে, শুরু হবে প্রতিমা ঘিরে ব্যস্ততা। শহরের মতো চোখধাঁধানো আয়োজন হয়তো থাকবে না, কিন্তু নিজেদের সামর্থ্যের মধ্যেই দেবীকে বরণ করার প্রস্তুতি নেবে আমজামতলা। একই জেলার একই উৎসব, কিন্তু উদযাপনের ছন্দ আলাদা। শহরের পুজোয় যেখানে প্রস্তুতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উন্মাদনা, সেখানে গ্রামের পুজোয় এখনও ভরসা সেই পুরোনো কথাতেই, ‘মহালয়ার পর থেকেই তো আসল পুজো শুরু।’

