তাপস মালাকার, নিশিগঞ্জ: আর কয়েকদিন পরেই পুজোমণ্ডপের সামনে জমবে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। ক্যামেরার ক্লিক, মোবাইল ফোনে নিজস্বী আর থিমের প্রশংসায় মুখর হবে চারপাশ। চোখধাঁধানো আলোকমালায় সেজে উঠবে চত্বর। কিন্তু সেই মণ্ডপেরই ঠিক কয়েক হাত দূরে রাত জেগে শেষমুহূর্তের রূপায়ণে মগ্ন অসংখ্য শিল্পী ও কারিগর। কারও হাতে করাত, কারও হাতে ছেনি-হাতুড়ি, কেউ বা নিপুণ হাতে ফুটিয়ে তুলছেন থার্মোকলের নকশা। তাঁদের ঘাম আর পরিশ্রমে গড়ে ওঠা কাঠামোতেই প্রাণ পাচ্ছে বড় বড় শিল্পীর কল্পনা। অথচ মণ্ডপের আলো জ্বলে উঠলে প্রচারের আলো থেকে বহুদূরে, কার্যত অন্ধকারে ঢেকে যান এই মানুষগুলিই।
দুর্গোৎসবের (Durga Puja 2026) এই নেপথ্য কারিগরদের কাছে উৎসবের অর্থ অন্যের আনন্দকে তিল তিল করে সাজিয়ে দেওয়া। নিজের সংসারে কতটা আলোর রোশনাই পৌঁছাবে, সেই হিসেব মেলানোর অবকাশটুকুও তাঁদের থাকে না। এঁরাই উৎসবের আসল ‘বিশ্বকর্মা’। ফালাকাটার বাসিন্দা রমেশ রায় পেশায় কাঠমিস্ত্রি। কাঠের টুকরো, হাতুড়ি-করাত আর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মেলবন্ধনে তাঁর হাতে জীবন্ত রূপ পায় জটিল স্থাপত্যের ভাবনা। নিশিগঞ্জের একটি পুজোমণ্ডপে এবার প্রাচীন মন্দিরের আদল ফুটিয়ে তুলতে কাঠের কাঠামো তৈরির দায়িত্ব রয়েছে তাঁর কাঁধে। বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে এসে মণ্ডপের পাশেই অস্থায়ী তাঁবু খাটিয়ে দিনরাত এক করে কাজ করছেন তিনি। উদ্দেশ্য একটাই— পুজোর এই মরশুমে যদি দুটো বাড়তি পয়সার মুখ দেখা যায়।
তবে আনন্দের চেয়ে রমেশের গলায় আক্ষেপের সুরই বেশি স্পষ্ট। তাঁর কথায়, ‘আমরা তো কোনও পুজোর সরকারি অনুদান বা বিশেষ ভাতা পাই না। দৈনিক হাজিরা আরও বৃদ্ধি হওয়া দরকার ছিল। এই সামান্য উপার্জনে এখন আর টানাপোড়েনের সংসার চলতে চায় না। মণ্ডপের উদ্বোধন হয়ে গেলে আমাদের কথা আর কেউ মনে রাখে না।’
একই লড়াইয়ের শরিক ডাউয়াগুড়ির যামিনী রায়। ডেকোরেটারের অধীনে প্যান্ডেল বাঁধার কাজ করেন তিনি। সারা বছর গ্রামে নিয়মিত দিনমজুরির কাজ মেলে না। পুজোর মরশুম এলে নামমাত্র হাজিরার বিনিময়ে চলে দিনভর অমানুষিক পরিশ্রম। সরকারি সাহায্য কিংবা কোনও সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা না মেলায় ক্ষোভ রয়েছে তাঁরও।
অন্যদিকে, থার্মোকলের পাত কেটে নিখুঁত অবয়ব ফুটিয়ে তুলছেন নিশিগঞ্জের শিল্পী রণজিৎ ডাকুয়া। তাঁর সূক্ষ্ম কারুকাজে মণ্ডপ আলাদা মাত্রা পেলেও অর্থমূল্যে এই কাজের মূল্যায়ন হয় না। রণজিতের কথায়, ‘এই কাজে সেভাবে লাভের মুখ দেখা যায় না। তবে হাজার হাজার মানুষ যখন মণ্ডপে এসে হাতের কাজের প্রশংসা করেন, তখন বুকটা ভরে যায়। আর্থিক অনটন থাকলেও মনের শিল্পীসত্তাটা তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে।’ রমেশ, যামিনী, রণজিতের মতো অসংখ্য শিল্পীর হাতের ছোঁয়াতেই থিম পায় শরীর, মণ্ডপ পায় প্রাণ। উৎসব ফুরোলে আলো নিভে যায়, কাঠামো ভেঙে পড়ে। কিন্তু এই নেপথ্য কারিগরদের জীবনসংগ্রাম অমলিন থেকে যায় আগামী পুজোর অপেক্ষায়।

