পিকাই দেবনাথ, কামাখ্যাগুড়ি: জলের ওপর আস্ত এক পুজোমণ্ডপ! তাও কৃত্রিম উপায়ে জল ধরে রেখে তার ওপর নয়, একেবারে নদীর ওপর। শুনতে অবাক লাগছে? কিন্তু মধ্য পারোকাটার পুলপার এলাকার এই পুজোমণ্ডপই একসময় ছিল আকর্ষণীয়। মরা রায়ডাক নদীর মাঝে মণ্ডপ তৈরি করে দুর্গাপুজোর (Durga Puja 2026) আয়োজন করত মধ্য পারোকাটা পুলপার সর্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটি। নদীর সেই পুরোনো স্রোত আজ আর নেই। কমেছে গভীরতাও। তবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর এবার ফের সেই জলে তৈরি হচ্ছে দুর্গাপুজোর মণ্ডপ। পুজোর ৫০তম বর্ষে ফিরে আসছে পুরোনো ঐতিহ্য।
পুজো উদ্যোক্তা সুবীর দে সরকারের কথায়, ‘সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষ্যে এবছর রাজস্থানের জয়সলমীরের রাজমহলের আদলে মণ্ডপ তৈরি করা হচ্ছে। আলিপুরদুয়ারের শিল্পীরা মণ্ডপসজ্জার কাজ করছেন। পাশাপাশি চন্দননগরের আদলে গোটা পুলপার এলাকা আলোয় সাজিয়ে তোলা হবে। কোচবিহারের শিল্পীরা সেই আলোকসজ্জার কাজ করছেন। স্থানীয় প্রতিমাশিল্পীর হাতে গড়ে উঠছে প্রতিমা।’ পুলপার দুর্গাপুজো কমিটির সম্পাদক নীতিশ সরকার জানান, ৫০তম বর্ষে বাজেট প্রায় ৮ লক্ষ টাকা। জোরকদমে পুজো প্রস্তুতি চলছে। অষ্টমী ও নবমীর দিন খিচুড়ি প্রসাদের ব্যবস্থা থাকবে। প্রায় ১০ হাজার মানুষ প্রসাদ পাবেন। এবারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সেই আগের মতো জলে পুজো।
স্থানীয় বাসিন্দা জয়দেব পালেন স্মৃতি, ‘একসময় পুজোর আগে এলাকার তরুণরা দল বেঁধে আশপাশের গ্রাম থেকে বাঁশ নিয়ে আসত। দিনরাত কাজ করে সেই বাঁশ দিয়ে তৈরি হত মণ্ডপ। স্থানীয় কয়েকজন বিশিষ্টের উদ্যোগে পাটকাঠির বেড়া ও ছনের ছাউনি দিয়ে প্রথমবার মণ্ডপ তৈরি হয়। ছোট পরিসরে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুজোকে ঘিরে এলাকার মানুষের উৎসাহ বাড়তে থাকে। পরে এলাকার তরুণদের মাথাতেই আসে অভিনব ভাবনা— নদীর জলের মাঝেই যদি মণ্ডপ তৈরি করা যায়! তখন থেকেই মরা রায়ডাকের জলের মাঝে তৈরি হতে থাকে মণ্ডপ।’ সেই মণ্ডপ দেখতে পুজোর কয়েকদিন দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতেন। দর্শনার্থীদের মণ্ডপে পৌঁছে দিতে নদীর ওপর তৈরি হত অস্থায়ী সেতু। ছোটদের কাছে সেই অভিজ্ঞতা ছিল রোমাঞ্চকর। এই অভিনব কায়দায় মোট আটবার দুর্গাপুজো হয়েছিল। শেষবার হয় ২০০১ সালে। তারপর থেকে এতদিন বন্ধ ছিল। সুবর্ণ জয়ন্তীর বছরে ফের সেই পুরোনো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হয়েছে পুজো কমিটি।
স্থানীয় বাসিন্দা রিপন সেনের কথায়, ‘এই পুজোর সঙ্গে এলাকার বহু মানুষের আবেগ ও স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন পর আবার একইভাবে জলের মধ্যে মণ্ডপ তৈরি হচ্ছে।’ ফলে সুবর্ণ জয়ন্তীর পুজো ঘিরে শুধু নতুন প্রজন্মই নয়, প্রবীণদের মধ্যেও ফিরে এসেছে পুরোনো দিনের স্মৃতি। মরা রায়ডাকের বুকে সেই স্মৃতিই যেন এবছর নতুন প্রাণ পাবে।

