প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান: দশ হাতে অস্ত্রের বিন্যাস নেই, কিংবা কেশরবিশিষ্ট সিংহের পিঠে চেপে অসুর সংহারের চেনা ছবিও অনুপস্থিত। সম্পূর্ণ মৃন্ময়ী প্রতিমার পরিবর্তে শুধুমাত্র দেবী দুর্গার অক্ষত মুখাবয়বকেই চার দশক পেরিয়ে সাড়ে চারশো বছর ধরে শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠা সহকারে আরাধনা (Durga Puja 2026) করে আসছে পূর্ব বর্ধমানের (Purba Burdwan) কেতুগ্রামের গোমাই গ্রামের বনেদি রায় পরিবার। শত শত বছর অতিক্রম করলেও পারিবারিক এই স্বতন্ত্র ধারায় কোনো পরিবর্তন আনেনি বর্তমান প্রজন্ম। ইতিহাস, অচলা ভক্তি এবং ব্যতিক্রমি অলৌকিক বিশ্বাসকে পাথেয় করেই নিজস্ব মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে রায়বাড়ির এই ঐতিহ্যবাহী দুর্গোৎসব।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মেমারির আদি বাসিন্দা বিত্তশালী ব্যবসায়ী গোবিন্দ রায় আনুমানিক সাড়ে চার শতাব্দী পূর্বে তৎকালীন পূর্ব বর্ধমানের মেমারি ছেড়ে কেতুগ্রামের গোমাই গ্রামে এসে স্থায়ীভাবে বসতি গড়েন। তাঁর উদ্যোগেই রায়পরিবারে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। তবে পূর্ণাঙ্গ রূপের বদলে শুধুমাত্র দেবীর মুখের আরাধনা ঘিরে দুটি লোককথা লোকমুখে আজও ঘুরে বেড়ায়। প্রথম ঘটনা অনুসারে, সূচনাপর্বের প্রথম বছরে নিয়মমাফিক দশভূজা প্রতিমাই নির্মাণ করানো হয়েছিল। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে মূল প্রতিমাটি দুর্ঘটনাবশত ভেঙে যায় এবং কেবল মস্তক থেকে গ্রীবা পর্যন্ত অংশটি অক্ষত থেকে যায়। হৃদয়ভাঙা গোবিন্দ রায় সেই রাতে স্বপ্নাদেশ পেয়ে দেবীর নির্দেশনা অনুসারেই ওই অক্ষত মুখভাগকে প্রতিষ্ঠা করে আরাধনা শুরু করেন।
দ্বিতীয় জনশ্রুতি মতে, স্থানীয় ঠাকরুন পুকুরে একদিন এক অপরূপা নারীকে স্নান করতে দেখেন গোবিন্দ রায়, যাঁর জলতলের ওপর কেবল মাথা ও গলার অংশটিই স্পষ্ট দৃশ্যমান ছিল। মুহূর্তের মধ্যে তিনি রহস্যময়ভাবে জলের গভীরে মিলিয়ে যান এবং পরবর্তীতে গোবিন্দ রায় স্বপ্নে মায়ের দেখা পান। লোককথার বাইরে থাকা এই গভীর অলৌকিক বিশ্বাসকেই পরম শ্রদ্ধায় আঁকড়ে ধরে রেখেছে পরিবারটি, যা দেখতে পুজোর দিনগুলোতে গোমাই ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অজস্র উৎসুক মানুষের সমাগম ঘটে।
আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও রায়বাড়ির পুজোয় দেখা মেলে কিছু ভিন্ন বৈচিত্র্য। সচরাচর দুর্গোৎসবে যে চণ্ডীপাঠ বাধ্যতামূলক থাকে, তা এখানে অনুপস্থিত। তবে বলিদানের প্রথা সম্পূর্ণ বজায় রাখা হয়েছে; কলার পাশাপাশি আখ, কুমড়ো এবং পাঠা বলির সংস্থান রয়েছে এখানে। বিজয়া দশমীতে বিসর্জনের দৃশ্যটিও অত্যন্ত মনোগ্রাহী। দেবীর মুখাবয়বটি সুসজ্জিত দোলায় বসিয়ে সর্বপ্রথমে সমগ্র গ্রাম পরিক্রমা করানো হয়। এরপর নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ঠাকরুন পুকুরেই বিসর্জন পর্ব সম্পন্ন হয়। এটি কেবল উৎসবের সমাপ্তি নয়, বরং নিজেদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব রক্ষাকল্পে এক পবিত্র আবেগ।

