জলপাইগুড়ি: রাজত্ব ও জৌলুস মুছে গেলেও ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যায়নি জলপাইগুড়ির (Jalpaiguri) বৈকুণ্ঠপুর রাজ এস্টেটের শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গাপুজো (Durga Puja 2026)। চলতি বছরে ৫১৭তম বর্ষে পদার্পণ করল এই রাজকীয় পুজো, যা জেলাজুড়ে এক অনন্য ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। ইতিহাস ঘাটলে জানা যায়, শিশু সিংহ এবং বিশু সিংহ নামে দুই যোদ্ধা এই রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা। ১৫০৯ সালে রাজা শিশু সিংহের হাত ধরেই রাজবাড়িতে দুর্গা পুজার প্রচলন। বর্তমানে রাজপরিবারের সদস্যসংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজন হলেও কুল-পুরোহিত শিবু ঘোষালের তত্ত্বাবধানে বছরভর নাটমন্দির ও রাজবাড়ির দেখভাল চলে। এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ হল এখানে দেবী নিত্যপুজিতা হন। রাজবাড়িতে একটি বহু প্রাচীন ছোট সোনার দুর্গা প্রতিমা রয়েছে, যার প্রতিদিন পুজার্চনা করা হয়। এছাড়া মূল ১৫ ফুট উঁচু মৃন্ময়ী প্রতিমার বর্ণ তপ্ত-কাঞ্চনের মতো এবং দেবী এখানে সালাঙ্কারা; তাঁর পরনে বেনারসি, হাতে-কানে সোনা-রুপোর গহনা এবং গলায় নবরত্নের হার শোভা পায়।
এখানকার প্রতিমা গঠন ও কাঠামোতেও রয়েছে বিশেষ স্বাতন্ত্র্য। সিংহ ছাড়াও দেবীর বাহন হিসেবে বাঘ বর্তমান এবং একচালা রথের ওপর পুরো ‘দুর্গা পরিবার’-এর সঙ্গে অবস্থান করেন মহেশ্বর, ব্রহ্মা ও বিষ্ণু। কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীর পাশাপাশি মায়ের দুই পাশে থাকে জয়া ও বিজয়া। বংশপরম্পরায় রাজপরিবারের কুলপুরোহিত শিবু ঘোষালের পরিবার এই পুজো পরিচালনা করে আসছে। কালিকাপুরান নীতি মেনে মহালয়ার দিন রাজপরিবারের উপস্থিতিতে তর্পণ, মায়ের চক্ষুদান ও কালীপুজো সম্পন্ন হয়। মহাঅষ্টমীর মধ্যরাতে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ ‘অর্ধরাত্রি পুজো’। অতীতে এই পুজোয় নরবলির প্রচলন থাকলেও সময়ের বিবর্তনে সেই প্রথা বদলে গিয়েছে। বর্তমানে নিয়মরক্ষার খাতিরে চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি মানুষের আকৃতির পুতুল এবং আটটি পায়রা বলি দেওয়ার প্রথা পালিত হয়। এছাড়া অষ্টমীতে সবার মঙ্গল কামনায় যজ্ঞ ও পাঠাবলিও হয়ে থাকে।
এই পুজোর আরেকটি বড় বিশেষত্ব হলো দেবীর আমিষ ভোগ। মহাসপ্তমীতে সাদা ভাতের সঙ্গে আড় মাছ, কাতল মাছ ও পটল চিংড়ি এবং সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত কাতল, ইলিশ, চিতল, পাবদা মাছ ও পাঠার মাংসের ভোগ নিবেদন করা হয়। আগের মতো জাঁকজমক না থাকলেও জলপাইগুড়ি তথা আশপাশের এলাকার মানুষ রাজবাড়ির পুজো দেখতে মুখিয়ে থাকেন এবং চারদিন ধরে চত্বরে বসে মেলা। বিজয়া দশমীতে সিঁদুরখেলা ও মিষ্টিমুখের পাশাপাশি এখানে প্রতিমা বিসর্জন হয় না; যেহেতু দেবী নিত্যপুজিতা, তাই বিসর্জনের পরিবর্তে হয় ‘নিরঞ্জন’। রাজপরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে সবাই মিলে রথ টেনে প্রতিমা রাজবাড়ির দিঘি পর্যন্ত নিয়ে যান এবং বিসাদের সুরের মাঝে সম্পন্ন হয় নিরঞ্জন। শান্তির জল মাথায় নিয়ে ভক্তরা চোখে জল ও মুখে হাসি নিয়ে বাড়ি ফেরেন, পরবর্তী বছরের প্রতীক্ষায়।

