এম আনওয়ারউল হক, বৈষ্ণবনগর : দেশভাগের ক্ষত, অনিশ্চয়তার দিন এবং অস্তিত্ব রক্ষার উদ্বেগ—সেই ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে বৈষ্ণবনগরের (Vaishalnagar) কৃষ্ণপুর হাটখোলা সর্বজনীন দুর্গোৎসব (Durga Utsav)। শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, স্থানীয়দের বিশ্বাস, আবেগ, মানত এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবেও এই পুজোর বিশেষ পরিচিতি রয়েছে।
পুজোর উদ্যোক্তাদের তরফে রাধেশ্যাম সরকার বলেন, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের (Partition) সময় সীমা নির্ধারণ নিয়ে গোটা অঞ্চলে চরম উৎকণ্ঠার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সীমান্তের কাছাকাছি এই এলাকার মানুষের মধ্যেও তখন নানা আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। সেই অনিশ্চয়তার সময় এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এবং প্রায় ১৬-১৭টি গ্রামের মোড়লরা একত্রিত হন। মানুষের উদ্বেগের মধ্যে তাঁরা দেবী দুর্গার কাছে প্রার্থনা করার সিদ্ধান্ত নেন। দেবীর চরণে কাতর আর্জি জানিয়ে মানত করা হয়—এই ভূখণ্ড যদি ভারতের অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাহলে প্রতিবছর ধুমধাম করে দেবী দুর্গার আরাধনা করা হবে। পরবর্তীতে সীমা নির্ধারণের মাধ্যমে এই এলাকা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই মানতের পুজো শুরু হয়।
সময়ের সঙ্গে পুজোর পরিধি বেড়েছে, বদলেছে অনেক কিছু। কিন্তু সেই প্রাথমিক বিশ্বাস ও আবেগ এখনও পুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে। পুজোকে ঘিরে বর্তমানে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি স্থানীয়দের অংশগ্রহণে নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচিও হয়। অষ্টমীর দিন ইসকনের ভক্তদের উপস্থিতিতে ভগবদ্গীতা পাঠের মাধ্যমে বিশেষ পুজোর সূচনা হয়। মণ্ডপ চত্বরে ধুনুচি নাচ, উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনিতে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়। মোমবাতি প্রজ্জ্বলনের মতো বিভিন্ন আচারেও ভক্ত ও দর্শনার্থীরা অংশ নেন। শুধু বড়রা নয়, এলাকার কচিকাঁচা ও তরুণদের উদ্যোগে নাচ, গান এবং নাটকের আসর বসে।
নবমীর সকালেও পুজোমণ্ডপে থাকে বিশেষ আবহ। এলাকার মহিলারা দলে দলে ডালি নিয়ে মণ্ডপে সমবেত হন। তাঁদের অংশগ্রহণে পুজো প্রাঙ্গণে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। দীর্ঘদিনের রীতিনীতি মেনে স্থানীয় মহিলাদের এই অংশগ্রহণ পুজোর অন্যতম পরিচিত ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে। কৃষ্ণপুর হাটখোলা সর্বজনীন দুর্গোৎসবের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উদ্যোক্তারা তুলে ধরেন পুজোমণ্ডপ ও মন্দির চত্বরের পরিচ্ছন্নতা এবং আন্তরিক পরিবেশকে।
করোনা-পরবর্তী সময়ে কয়েক বছর আগে নতুন করে মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। সেই মন্দির চত্বরেই বর্তমানে পুজোর আয়োজন হয়। প্রতিমাও বাইরে থেকে নিয়ে আসার পরিবর্তে মণ্ডপেই স্থানীয় শিল্পীদের দিয়ে তৈরি করা হয়। দশমীতে দেবীকে বিদায় জানাতে শোভাযাত্রা বের হয়। ঘোষপাড়ার ভিতর দিয়ে সেই শোভাযাত্রা স্থানীয় মূল বাজার প্রদক্ষিণ করে। পরে শোভাযাত্রা সহকারে স্থানীয় জলাশয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। ১৯৪৭ সালের এক অনিশ্চিত সময়ে একটি মানত থেকে যে পুজোর সূচনা, আজ তা বহু প্রজন্মের স্মৃতি ও আবেগের অংশ।
