- অনিন্দিতা গুপ্ত রায়
‘কী সুজনবাবু কোথায় চললেন এতগুলো ব্যাগ নিয়ে?’
‘ব্যাগ নিয়ে সকালসকাল মানুষ কোথায় যায় বলুন দিকি? বাজার বাজার!’
‘আপনি, আর বাজার! তাও এই সাতসকালে আর এতগুলো ব্যাগ নিয়ে? ও দপ্তর তো বৌদির!’
‘না মশাই, তিনি তার গাইদের নিয়ে ব্যস্ত আর আমার ঘাড়ে এই গুরুদায়িত্ব তাদের জামাইষষ্ঠীর জন্যই’
‘গাই? গোরু পুষেছেন নাকি বৌদি? গোরুদেরও জামাইষষ্ঠী হয় বুঝি?’ ঘোষবাবু হাঁ হয়ে যান!
‘‘আরে দূর মশাই! গোরু কেন পুষবেন! এ হল গাইজ! গাইজ! তার ইউটিউব চ্যানেলের গাইজরা! আপনি সাবস্ক্রাইব করেছেন তো ‘বাংলার গুস্টির ফিস্টি’ চ্যানেলটা? করে নেবেন।”
‘বলেন কী? ইউটিউব চ্যানেলে ষষ্ঠীপুজোর এত আয়োজন?’
‘আর বলবেন না! নিজের শ্বশুরবাড়ির পাট কোনকালে চুকেছে, আর এত খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারও ছিল না সেখানে মশাই। দুজ্ঞাষষ্ঠী থেকে জামাইষষ্ঠী সবেতেই নিরামিষ! নিজের মেয়েও নেই জামাইও নেই। এই বুড়ো বয়সে তোমাদের বৌদি কোত্থেকে পাতানো জামাইদের ধরে এনেছেন ইভেন্টের জন্য! এই চড়া বাজারে এখন গচ্চা দাও কয়েক হাজার! কোনও মানে হয় বলুন তো?’
ঘোষবাবু চমৎকৃত চিত্তে বাজারে ঢুকে ছ্যাঁকা খান। ইলিশ চিতল কাতলের পেটি তো না যেন পেটি পেটি সোনার বাঁট! যাঁরা সেগুলো ব্যাগস্থ করছেন আজ তাঁদের র্যালাই আলাদা। ভাবছিলেন ভেটকির ফিলে নেবেন অল্প করে, তা সবই না কি বুকড! অল্প দেওয়া যাবে না! কারা এত খায়, রাঁধে আর খাওয়ায়! তাঁর নিজের মেয়ে জামাই, ছেলে বৌমা সবাই প্রবাসে। গিন্নি ভিডিও কলে কীসব হাওয়া বাতাস দিয়ে কাজ সারেন। দু’পক্ষেরই অনলাইনে উপহার আদানপ্রদান। বহু আগেই নিজের শ্বশুর-শাশুড়ি গত হয়েছেন। আর ওই জিলিপির প্যাঁচওয়ালা শালাবাবুকে মনে মনে ঘোষমশাই ‘বাবু’ বাদ দিয়েই ডাকেন। তাই ও পর্ব চুকেছে।
তাঁর নিজের ছোট বোন শাশুড়ি হবার পর জামাইষষ্ঠীটি অবশ্য দেখার মতোই ছিল! লাল সিল্কের ধুতি হলুদ পাঞ্জাবি পরা, গলায় সোনার চেন, হাতে আটখানা দামি আংটি বালা শোভিত প্রভাবশালী জামাই, সঙ্গে তার বিরাট ক্যামেরা আর ছবি তোলার লোক! প্রি-ওয়েডিং ইত্যাদির মতো মেয়ের আবদারে নাকি জামাইষষ্ঠী স্পেশাল ফোটোগ্রাফার ভাড়া করতে হয়েছে। টাকার অঙ্কটা বাড়ি ফিরে গিন্নির কাছে শুনে চমকে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁর সাধের ভাগ্নিটি এই উপলক্ষ্যে মুম্বই থেকে এসেছে প্রচুর উপহার সহ। সেসবই হাইটেক। তা জামাইবাবাজির মাথায় ডালা ঠেকানো আর পাখার হাওয়া দেওয়ার ছবির গোটা সাতাশ টেক হয়েছিল বটে! ফোটোগ্রাফার ছেলেটি বারবার কাকিমা পিসিমা বৌদি গোত্রীয়দের ধমকে সরাচ্ছিল তারা ফোটোফ্রেমে চলে আসছিল বলে। জামাই আর মেয়ের সঙ্গে পাঁচবার পোশাক বদলে উঠোন বারান্দা ছাদ বাগান ঘুরে ঘুরে বরণডালা নিয়ে শাশুড়ি মায়ের স্ট্রোক হওয়ার জোগাড় জ্যৈষ্ঠের কাঁঠাল পাকা গরমে! তারপর কেটারার আয়োজিত পিলে চমকানো নামের সব রেসিপি! ‘সুক্তোর সুখসায়র’ থেকে ‘মটমটে মাটন’ হয়ে ‘দে দমাদম দই’ আর তাদের ফোটোসেশন হাতে মুখে প্লেটে শোভিত হয়ে নানাভাবে। সারা পাড়া আত্মীয় মহলের তাক লেগে গিয়েছিল এ হেন আয়োজনে। যাঁরা নিমন্ত্রিত ছিলেন না, সোশ্যাল মিডিয়ায় চিত্র প্রদর্শনী দেখে হিংসায় বেনিয়াসহকলা দশা তাঁদের!
একে রবিবার তায় আবার ষষ্ঠী! মুরগির দোকানে ভয়ে ভয়ে প্রবেশিলেন ঘোষবাবু যেন নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে লক্ষ্মণ! ঝপাঝপ গলা নামানোর ফাঁকে নিতাই চিৎকার জুড়েছে—‘সোসটিপূজা ইস্পেশাল মুরগি! নিয়ে যান শ্বশুরেরা। আজ আপনারা বড় মুরগি না এরা হয়ে যাক চ্যালেঞ্জ!’ ‘কী রে ব্যাটা, তোর ষষ্ঠীপুজো নেই? যাবি না?’ খদ্দেরের প্রশ্নের উত্তরে নিতাই খ্যাঁক খ্যাঁক হাসে ‘বৌ-ই নাই তার ষষ্টী! তবে আমি হোটেলে গিয়ে ইস্পেশাল জামাই থালা সাঁটিয়ে আসব। তবে জামাই না বলে আপনের মতো কামাই হবে না আমার’
এ ব্যবস্থা অবশ্য মন্দের ভালো। বাজার দোকান এসবের ঝামেলা নেই, ফ্যালো কড়ি মাখো তেল! থরে থরে বুটিক রেস্তোরাঁয় রেস্ত ফেললেই থিম অনুযায়ী থালি। গাঁদা ফুল গোলাপ ফুল প্রদীপ সব পাবেন, এমনকি শ্বশুরের হাড়ে গজানো দুব্বোও। দেদার ছবি তোলো আর পোস্টাও। একবার নাকি কোন একটা গ্রুপে ‘আমার জামাইষষ্টীর রান্না’ থিমে দেখা গিয়েছিল নিজের রান্না বলে তিনজন একই রেস্তোরাঁর আইটেম লটকে দিয়েছে! এডিটের পরেও টেবিল আর প্ল্যাটার সাজানো দেখে গ্রুপের গোয়েন্দা বিভাগ সেসব ধরে ফেলে। তারপর ঘটনাপ্রবাহের জেরে গ্রুপটাই উঠে যায়। ঘোষগিন্নি সমাজমাধ্যম খুঁজে জামাইষষ্ঠীর পোস্টে কোন জামাই নাকি খালি গায়ে হাফ প্যান্ট আর কোন শাশুড়ি ম্যাক্সির ওপর ওড়না গায়ে জড়িয়ে থাকায় হেব্বি নিন্দার ঝড়, সে সব শোনাবেন আজ আবার। কেউ কেউ লিখবেন, ‘ম্যা গো! লোকে প্লাস্টিকের টেবিলে কীভাবে খায়!’ ‘শিট! ফুলছাপ টেবিল কভারে স্টিলের থালা দিয়ে জামাইষষ্ঠী!’ এর নাম না কি খাপ বসানো। একেবারে খাপে খাপ জামাইয়ের বাপ যারে কয়! আচ্ছা ‘জামাই আদর’ কথাটার মধ্যে আদরের থেকে শ্লেষই কিঞ্চিৎ বেশি না?
মর্নিং ওয়াকে আসা নতুন প্রজন্মের ডায়েট সচেতন ছেলেমেয়েদের কাছে শুনেছেন জামাইষষ্ঠীর খাওয়া অনেকের কাছেই উপদ্রব বিশেষ। চিয়া সিডের পুডিং আর ওটস স্মুদি জায়গা নেয় লুচি বেগুনভাজার। এই দিনটি নেহাত সবাই মিলে জমায়েত হয়ে আনন্দ অজুহাত খুঁজে নেওয়া ছাড়া কিছু নয় আর। সেখানে জামাই বা বৌমা দুই-ই ইদানীং সমান আদরণীয় অনেকের ঘরেই। বেশ ভালো লাগে এই পরিবর্তনটুকু। আদিখ্যেতা আর আদেখলামো বাদ দিয়েও তো আজও চোরা চাপ থাকে অনেক আর্থিক সংগতিহীন বাড়িতে জামাই আপ্যায়নের। ঘোষবাবু একটা গন্ধরাজ গাছের চারা কেনেন, অরণ্যষষ্ঠী পালন করা গিন্নির জন্য।
গলিতে ঢোকার মুখে দেখা যায় সুবীরবাবুর বাড়ির সামনে জটলা। জানুয়ারিতে বিয়ে হয়েছে তাঁর একমাত্র কৃতী মেয়েটির। আজ তো তবে উৎসব সুবীরবাবুর বাড়িতেও। ভিড় থেকে উড়ে আসা কথায় জানা গেল সুবীরবাবুর হার্ট অ্যাটাক। ‘ইসস মেয়ে জামাই দুজনের স্কুল চাকরি একসঙ্গে চলে গেল! এত ব্রিলিয়ান্ট ওরা!’ বাবার হার্ট অপারেশন, মায়ের ডায়ালিসিস সামলানো মেয়েটির অসহায় মুখ ধাক্কা মারে বুকে।
ঘোষবাবুর হাতের ব্যাগটা হঠাৎ খুব ভারী মনে হয়। ঘাম হয় খুব। রাস্তার পাশে বট গাছের নীচে ভবঘুরে পাগলিটা আর তার পোষা বেড়ালটা। পাগলি হাততালি দিয়ে হাসতে থাকে-ভারী মজা, ভারী মজা। বেড়ালটা নির্বিকার থাবা চাটে, হাওয়া শোঁকে। আহা, পাড়াজুড়ে আঁশটে গন্ধ! আজ খোরাকটা মন্দ মিলবে না যা হোক!
(লেখক সাহিত্যিক ও শিক্ষক। জলপাইগুড়ির বাসিন্দা)
