তমালিকা দে, শিলিগুড়ি: সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর মাকে নিয়ে এক স্কুল পড়ুয়ার কুরুচিকর মন্তব্য সংক্রান্ত ভিডিও অনেকেরই রক্তচাপ বাড়িয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া আখেরে এই প্রজন্মকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, এই ভিডিও তারই জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। এতদূর পড়ে যদি মনে হয় এতেই শেষ, তবে ডাহা ভুল হবে (Digital Dependancy)। সোশ্যাল মিডিয়ায় রিলস বানিয়ে দ্রুত ভাইরাল হওয়ার নেশা এক প্রজন্মকে রীতিমতো গ্রাস করে চলেছে। আর এরই জেরে পাল্লা দিয়ে ভুলের মাশুল গোনাও চলছে।
শহরের এক স্কুল ছাত্রীর কথাই ধরা যাক। মডেল হওয়ার প্রলোভনে পা দিয়ে নিজের আপত্তিকর ছবি পাঠিয়ে সে এখন রীতিমতো হাত কামড়াচ্ছে। বছরখানেক আগে ইনস্টাগ্রামে এক অচেনা তরুণের সঙ্গে তার পরিচয়। ওই তরুণ তাকে মডেলিংয়ের লোভ দেখায়, আর এই সূত্রেই তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু প্রতারণার এই ফাঁদ বুঝতে পেরেই শেষমেশ মেয়েটির স্বপ্নভঙ্গ। বর্তমানে ওই তরুণ আপত্তিকর ছবিগুলি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ। ভয়ের চোটে পরিবারকে কিছু না জানিয়ে ওই কিশোরী শেষমেশ দার্জিলিং জেলা লিগ্যাল এইড ফোরামের দ্বারস্থ হয়।
এসব দেখে আর পাঁচজনের মতো শিলিগুড়ি জেলা হাসপাতালের অন্বেষা ক্লিনিকের কাউন্সেলর পিয়ালি পাইরাও যথেষ্ট চিন্তিত। তাঁর কথায়, ‘সরকারি স্কুলগুলোতে পড়ুয়াদের কাউন্সেলিং করতে গিয়ে ওদের মুখে ভার্চুয়াল সেক্স, ভার্জিনিটি সংক্রান্ত বিষয়গুলি শুনে চমকে যাচ্ছি। ওদের যা বয়স তাতে এখনই ওরা এসব জানতে পেরেছে বলে ভাবতেই পারছি না।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ভাইরাল হওয়ার টান অনেককেই চোরাস্রোতে টেনে নিচ্ছে বলে পিয়ালির ধারণা।
স্মার্টফোন এখন সবার হাতের মুঠোয়। এই সূত্রে সবারই সহজে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোরাফেরা। ভার্চুয়াল জগতের হাতছানিতে কিশোর-কিশোরীরা আজ নতুন বন্ধু পাতাতে মরিয়া। ইন্টারনেটে দেখানো সবকিছুকেই নকল করার মরিয়া চেষ্টা। কিন্তু আখেরে তাতে যত না লাভ হচ্ছে, তুলনামূলক ক্ষতির পাল্লাটাই ভারী। মুখ্যমন্ত্রীকে কুমন্তব্য করা ছেলেটির বিষয়ে প্রশাসন ব্যবস্থা নিলেও, যারা সেই ভিডিওটি তুলছিল তারা ওই পড়ুয়াকে সেই সময় কেন ঠেকাল না, সেই প্রশ্নও জোরালো হয়েছে। ভিডিও ভাইরাল করার নেশা তাদের মধ্যে সমানভাবে কাজ করেছিল বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের চিকিৎসক উত্তম মজুমদার বললেন, ‘এই বয়সে হরমোনের পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক জগতেও নানা পরিবর্তন আসে। একারণেই কমবয়সিরা সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি সময় কাটাতে ভালোবাসে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় মাত্রাতিরিক্ত সময় কাটানোর পাশাপাশি, ভুলভাবে কাটানো সময় মনে অনেকটাই প্রভাব ফেলছে।’
বর্তমানে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের জন্য সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত কাউন্সেলিং চললেও, পরিস্থিতি বিবেচনা করে অষ্টম শ্রেণি থেকেই সচেতনতা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। দার্জিলিং জেলা লিগ্যাল এইড ফোরামের সভাপতি অমিত সরকার বলেন, ‘আনন্দ পাওয়ার জন্য স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা এমন অপরাধে পা দিয়ে থাকে যা কল্পনাও করা যায় না। ভুল হয়েছে বলে বুঝতে পেরে ওরা পরে আমাদের দ্বারস্থ হয়।’ সমস্যা মেটাতে স্কুলে আরও সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন বলে অমিতের বক্তব্য।
শিলিগুড়ির একটি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার কথায়, ‘বাড়িতে সন্তানরা ফোনে কী করছে সে বিষয়ে বাবা-মায়েদের নজরদারি সবসময়ই প্রয়োজন।’ পঞ্চম শ্রেণি থেকেই সাইবার সচেতনতা ও নজরদারি প্রয়োজন বলে শিলিগুড়ি বরদাকান্ত বিদ্যাপীঠের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক তমাল চন্দ মতপ্রকাশ করেছেন।

