শুভাশিস বসাক, ধূপগুড়ি : ২০২৫-এর ৫ অক্টোবর। বিজয়া দশমীর রেশ কাটতে না কাটতেই আছড়ে পড়েছিল জলঢাকা নদীর বাঁধভাঙা জল। তছনছ হয়েছিল ধূপগুড়ি ব্লকের হোগলাপাতা, কুল্লাপাড়া, বগরিবাড়ি সহ বিস্তীর্ণ এলাকা। জলের তোড়ে ধূলিসাৎ হয়েছিল অসংখ্য মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই। দেখতে দেখতে বছর ঘুরেছে। উমার আগমনের সময় হল। বাতাসে শারোদৎসবের ঘ্রাণ। কিন্তু প্রলয়ের সেই ক্ষতচিহ্ন এখনও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে বাসিন্দাদের। সেকারণে উৎসবের আমেজ উধাও। তিন গ্রামের বেশিরভাগ ক্ষতিগ্রস্তই এখনও ক্ষতিপূরণের দ্বিতীয় দফার টাকা পাননি। নদীর জলে ভেসে আসা পলিতে চাষের জমিরও ক্ষতি হয়েছিল যথেষ্ট। হোগলাপাতার বাসিন্দা আশানন্দ মণ্ডলের কথা, ‘ধানের জমির ক্ষতি হয়েছিল বিপর্যয়ে। কিন্তু ক্ষতিপূরণ পাইনি। আদৌ মিলবে কি না জানি না। আন্দোলনও করেও সুরাহা হয়নি।’
এবিষয়ে ধূপগুড়ি ব্লক প্রশাসন এবং মহকুমা প্রশাসনের আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ না করায় প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তবে জলপাইগুড়ির সাংসদ জয়ন্ত রায় বলেছেন, ‘আগের সরকারের কথা বলে লাভ নেই। একজনের আবাস যোজনার টাকা আরেকজনকে দিয়েছে। দুর্নীতি করেছে।’ তাঁর আশ্বাস, ‘রাজ্য সরকারের সঙ্গে কথা বলব। কেউ যদি ক্ষতিপূরণ না পেয়ে থাকেন, তাহলে খোঁজ নিয়ে দেখব।’
বৃহস্পতিবার ধূপগুড়ি থেকে ডাউকিমারি হয়ে বগরিবাড়ি পৌঁছে দেখা গেল, বিপর্যয়ের ক্ষত রয়ে গিয়েছে বছর পরও। রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা, যেন কেউ খুবলে খেয়েছে। ঘরবাড়ি এখনও অনেকেই মেরামত করে উঠতে পারেননি। বগরিবাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে হোগলাপাতা গ্রাম। সেখানে থেকে মেঠো পথ ধরে দেড় কিলোমিটার এগোলে কুল্লাপাড়া। নদী এই দুই গ্রামের প্রতি বোধহয় সবচেয়ে বেশি নির্দয় ছিল। কুল্লাপাড়া ও হোগলাপাতা গ্রামের ২৫-৩০টা পরিবার আজও বসবাস করছে তাঁবুর নীচে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ করেছিল তৎকালীন তৃণমূল সরকার। এর মধ্যে প্রথম দফায় ৬০ হাজার টাকা পেয়েছেন অধিকাংশ গ্রামবাসী। যদিও দ্বিতীয় দফার ৬০ হাজার কবে ঢুকবে, উত্তর অজানা।
হোগলাপাতার বাসিন্দা অভি মণ্ডলের কথা, ‘ঘর মেরামতের প্রথম দফার টাকা তো জলের তোড়ে সৃষ্ট গর্ত ভরাটেই চলে গিয়েছে। অনেকেই পলিথিনের তাঁবু খাটিয়ে ও চালাঘর তৈরি করে থাকার বন্দোবস্ত করেছেন। কিন্তু এভাবে কতদিন? কবে বাকি টাকা মিলবে জানা নেই।’ ওই গ্রামেরই চম্পক নাগ বলছেন, ‘গ্রামের হাল ফেরাতে প্রশাসন বা সরকার তেমন কোনও উদ্যোগ নেয়নি। যে কারণে আমরা স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারিনি।’
এদিকে, পুজোর বাকি আর মাত্র ক’টা দিন। তিনটি গ্রামেই উধাও পুজোর আমেজ। হতাশার মাঝে ভালো খবর এটা যে, বগরিবাড়ি গ্রামে পুজো হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা অভিজিৎ রায়ের কথা, ‘পুজো অবশ্যই হবে। কিন্তু ঘরের হাল তো ফেরেনি। সেকারণে পুজোর আনন্দ বা উৎসবের আমেজ মন থেকে হারিয়ে গিয়েছে। সব স্বাভাবিক হয়ে যাক, দেবীর কাছে প্রার্থনা রাখব।’

