সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, নিউ জার্সি: আমেরিকার মাটিতে গত এক মাস ধরে বিশ্বকাপের প্রতিটি স্পন্দন খুব কাছ থেকে দেখার পর একটা কথা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি- ফাইনালের আগের ৪৮ ঘণ্টা সব দলের কাছেই চরম স্নায়ুর চাপের (World Cup Closing Argentina vs Spain)। নিউ জার্সিতে হাডসন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে যখন মেটলাইফ স্টেডিয়ামের মেজাজটা বোঝার চেষ্টা করছি, তখন আর্জেন্টিনা এবং স্পেন- দুই শিবিরের অন্দরমহলের ছবিটা একেবারে দুই মেরুর। একদিকে ফিফার সূচি নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন সাধারণত শান্ত স্বভাবের লিওনেল স্কালোনি, অন্যদিকে স্প্যানিশ শিবির যে কোনও প্ররোচনা এড়িয়ে ঠান্ডা মাথায় নিজেদের কাজ হাসিল করার ছক কষছে।
আটলান্টায় প্রবল ঝড়ের কারণে বৃহস্পতিবার রাতে নিউ জার্সিতে পৌঁছাতে আর্জেন্টিনার বেজে যায় রাত এগারোটা। টানা ১৫ দিনে এটা তাদের পঞ্চম ম্যাচ। নকআউটের এই শেষ পর্যায়ে এসে ফুটবলারদের চোট-আঘাত আর ক্লান্তি যখন চরম সীমায়, তখন ফিফার সূচি মেনে পরদিন দুপুর সাড়ে ৩টার কাঠফাটা রোদে অনুশীলন করতে বাধ্য হয় বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এই অমানবিক সূচিতেই বিরক্তি প্রকাশ করেছেন স্কালোনি। তাঁর কথায়, ‘ছেলেরা বিশ্রাম নেবে কখন? আমাদের জোর করে এমন একটা সময়ে অনুশীলন করানো হল, যেটা আমরা চাইনি। সাংবাদিক সম্মেলনের পর বড্ড অদ্ভুত আর তাড়াহুড়ো করে সারা হল একটা ট্রেনিং সেশন, যেখানে ফাইনালের আগে নতুন কিছু পরখ করে দেখার কোনও সুযোগই মিলল না।’ দলের অনেকেই যে এখনও পুরো ফিট নন, তা-ও অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন তিনি।
আর্জেন্টিনা কোচ যখন ফিফার অব্যবস্থা নিয়ে বিরক্ত, তখন স্পেনের রড্রি বা লুইস দে লা ফুয়েন্তে কিন্তু পা রাখছেন মাটিতেই। ফাইনালে উঠে বিরাট কিছু করে ফেলেছেন, এমন হাবভাব তাঁদের নেই। বরং তাঁরা জানেন, ফাইনালে আর্জেন্টিনা তাঁদের শারীরিক সক্ষমতার চূড়ান্ত পরীক্ষা নেবে। রড্রি যেমন পরিষ্কার বলে দিলেন, ‘আমরা কোনও প্ররোচনায় পা দেব না। নিজেদের স্টাইল ধরে রাখাই আমাদের কাজ। আমরা জানি ম্যাচটা অসম্ভব ফিজিকাল হতে চলেছে, আর তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা আমাদের আছে।’ স্কালোনির দলকে ফুয়েন্তেও ‘গত আট-দশ বছরের সেরা দল’ বলে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়ে রাখলেন।
তবে নিউ জার্সির এই সাংবাদিক সম্মেলনে সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ঘুরেফিরে এল সেই অবধারিত প্রশ্ন- এটাই কি ৩৯ বছরের লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ? প্রশ্নটা শুনে স্কালোনি এবং এমিলিয়ানো মার্টিনেজ দুজনেই হাসলেন। স্কালোনির আবেগঘন জবাব, ‘এই উত্তরটা শুধু লিও দিতে পারবে। ও নিজেই একটা জীবন্ত ইতিহাস। ৩৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠাটা অবিশ্বাস্য। দিয়েগোকে (মারাদোনা) আমরা খুব মিস করি, কিন্তু লিও এখনও আমাদের সঙ্গে আছে। আসুন না, ওকে শুধু উপভোগ করি।’
আর সেই মেসি? সঞ্চালকের প্রশ্ন বুঝতে একটু সময় নিলেও, উত্তর দিলেন স্বভাবসিদ্ধ দৃঢ়তায়। বার্সেলোনায় তিন মাসের শিশু লামিন ইয়ামালকে স্নান করানোর সেই বিখ্যাত ছবিটার প্রসঙ্গ উঠতেই মুচকি হাসলেন। বললেন, ‘ছবিটা দারুণ, তাই না? আর আজ আমরা দুজনেই একসঙ্গে বিশ্বকাপের ফাইনালে! ইয়ামাল বিশ্বের অন্যতম সেরা। ওর সামনে এক উজ্জ্বল কেরিয়ার পড়ে আছে। ওকে অনেক শুভেচ্ছা, তবে রোববার বিশ্বকাপটা ও যাতে জিততে না পারে, তার জন্য আমরা আমাদের সবটুকু উজাড় করে দেব।’
১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর দীর্ঘ ৬৪ বছরে কোনও দেশ টানা দু’বার বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। স্পেনের তারুণ্য আর সংঘবদ্ধ ফুটবলের সামনে দাঁড়িয়ে রবিবার নিউ জার্সিতে সেই ইতিহাস গড়ারই অপেক্ষায় মেসির আর্জেন্টিনা।

