উৎসবের আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকে সামর্থ্য, অপেক্ষা আর ছোট ছোট পারিবারিক স্বপ্ন।
জয়দেব সাহা
হারিয়ে যাওয়ার কতগুলো গল্প আছে। শুনবে? শুনবে একটি পরিবারের বেড়ে ওঠার গল্প আর তার সঙ্গে দেখবে তাদের পুজোর রূপরেখা? গল্পটা বড্ড সাদা-কালো, অথচ স্পষ্ট, বলা যায় ভীষণ রকমই স্পষ্ট। উত্তরের চা বাগান থেকে খানিকটা দূরে এই পরিবারের বসবাস। বসবাস বলতে গেলে দুটো ছোট ছোট ঘর আর সেখানে বাড়তে থাকা একগুচ্ছ স্বপ্ন। বাড়িতে চারজন থাকে। দশ বছরের ছেলে সোনু, তার থেকে পাঁচ বছর বড় দিদি রিমিক, সঙ্গে বাবা-মা। বাবা সারাবছর দিনমজুরের কাজ করেন। কোনও দিন কাজ জোটে, কোনও দিন জোটে না। অভাবের সংসারে তাঁর একটাই স্বপ্ন, ছেলেমেয়ে দুটিকে মানুষ করা। যেদিন কাজ জোটে, সেদিন সোনু আর রিমিকের জন্য কিছু না কিছু কিনে আনেন। খুব অল্প দামের হলেও, কখনও চকোলেট, কখনও বিস্কুট, অথবা অন্য কিছু। আর এই অল্প কিছুর জন্যই মুখিয়ে থাকে বাচ্চা দুটো। অপেক্ষা করে কখন সন্ধ্যা হবে আর বাবা বাড়ি ফিরবে।
বিশেষ করে দশ বছরের ছোট ছেলের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। ও অভাবের বিশেষ কিছু বোঝে না। বড় মেয়েটা বুঝতে শিখেছে বাবা কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছে। ও জানে, ওদের সামর্থ্য খুব কম। এত সবের মধ্যেও ওর বাবা সংসারটার হাল ধরে রেখেছেন। খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে জামাকাপড়ের খরচ, দুই ভাইবোনের স্কুলের বইখাতা, টিউশনির মাইনে, সব যেন কোনওভাবে চলে যাচ্ছে। এরই মধ্যে হাজির হল পুজোর মাস। উমার বাড়ি আসার পালা। চারদিকে উৎসবের মরশুম। জায়গায় জায়গায় বাঁশ গাঁথা শুরু হয়েছে। কুমোরটুলিতে মায়ের প্রতিমা তৈরি হচ্ছে। শরতের শিউলি আর নদীপাড়ের কাশবন জানিয়ে দিচ্ছে যে মা আসছেন। বাজারে বিকেল হলেই জমজমাট ভিড়। পুজোর কেনাকাটার হিড়িক লেগেছে। স্কুলে যেতে আসতে, সাইকেল নিয়ে টিউশনি যাওয়ার পথে সোনু সব দেখতে পায়। বাড়ি এসে বাবার কাছে বায়না করে, ‘বাজারের সব ভালো ভালো জামা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। তুমি আমাকে কবে জামা কিনে দেবে?’
বাবা বলে, ‘এখন তো পুজো আসতে অনেক দেরি। আর ক’টা দিন দাঁড়া, বাজারে আরও ভালো ভালো জামা আসবে। এখন তো সব আগের বছরের জামাগুলো বিক্রি করছে।’ রিমিক সব শুনে কিন্তু কিছুই বলে না। কোনও বায়নাও করে না। ও বোঝে বাবা এখন সেরকম কাজ পাচ্ছেন না। সংসারে খুব টানাটানি। র্যাশনে পাওয়া চাল আর আটা দিয়ে সংসার চলছে। বাড়িতে গ্যাস শেষ হয়ে গিয়েছে সেই কবে, মা এখন উনুনে রান্না করে। যাদের দিন এনে দিন খেয়ে অবস্থা, তাদের জন্য পুজোর বাড়তি খরচ ভাবনারও বাইরে। কিন্তু যত পুজোর দিন কাছে আসছে, ততই সোনুর বায়না বাড়ছে পুজোর জামা কেনার। শরতের শিউলি আর কাশবনের সৌন্দর্য সোনুর বাবার কাছে আনন্দের নয়, বরং চিন্তার রূপরেখা নিয়ে আসে।
এরই মধ্যে বেশ কয়েক দিন টানা কাজ পাওয়া গেল, হাতে খানিকটা টাকা এল। পুজোর সপ্তাহখানেক আগে সোনু পেল নতুন জামা। কিন্তু রিমিক? ও জানে, পুরোনো তুলে রাখা জামাতেই সারতে হবে এবারের মায়ের আগমনী দিনগুলো। পুজো যে সবার জন্য একরকম নয়, সেই কথাটা রিমিকের মতো কিশোরীই সবচেয়ে আগে বুঝতে শেখে। সোনুর কাছে পুজো নতুন জামার অপেক্ষা, রিমিকের কাছে পুজো বাবার ক্লান্ত মুখ আর সংসার সামলে রাখার চুপচাপ গল্প। একদিকে শিশুমনের বায়না, অন্যদিকে সংসারের হিসাব। একই বাড়িতে থেকেও পুজো তাই দুজনের কাছে দুই রকম হয়ে ওঠে।
উমা এলেন। চারদিকে আলো, ভিড়, বাজারের কোলাহল, পুজোর প্রস্তুতি। কারও ঘরে নতুন পোশাক, কারও ঘরে পুরোনো জামা ধুয়ে শুকোচ্ছে। কারও কাছে পুজো মানে কেনাকাটার আনন্দ, কারও কাছে বাড়তি খরচের চিন্তা। তবু এই পরিবারের স্বপ্ন থেমে থাকে না। বাবা কষ্ট করে সংসারের হাল ধরে থাকেন, মা উনুনে রান্না করেন, সোনু নতুন জামা পরে আনন্দ খোঁজে, আর রিমিক চুপ করে দেখতে শেখে জীবনের হিসাব। পুজো সবার ঘরে আসে, কিন্তু তার আলো সবার উঠোনে সমান হয়ে আর নামে কই!
(লেখক আইআইটি পাটনায় গবেষণারত)

