সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, মায়ামি: ফুটবল কি শুধুই ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা কিছু ডেটা আর অ্যালগরিদম? পরিসংখ্যানের নিখুঁত হিসেব কি সত্যিই শেষ কথা বলতে পারে? বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের একটা রুদ্ধশ্বাস রাত যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, অঙ্কের হিসেব মাঝে মাঝেই কেমন বোকা বনে যায়!
গ্রুপ পর্বের ঠিক পরেই ফিফার সদ্য প্রকাশিত ডেটা-ভিত্তিক ‘পাওয়ার র্যাংকিং’ নিয়ে গোটা ফুটবল বিশ্ব তোলপাড় হয়েছিল। লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপে বা ভিনিসিয়াস জুনিয়ারদের মতো জাদুকরদের পিছনে ফেলে বিশ্বের এক নম্বর ফুটবলার হিসেবে উঠে এসেছিল এক অচেনা নাম-জার্মানির ডেনিজ উন্দাভ (Deniz Undav)! মাঠের আক্রমণ, সৃজনশীলতা এবং রক্ষণের নিখুঁত ডেটা বিশ্লেষণ করে মেসি ছিলেন দুই নম্বরে, আর ২৯ বছরের কুর্দিশ-ইয়াজিদি শরণার্থী ডেনিজ বসেছিলেন সেরার সিংহাসনে। গ্রুপ পর্বে পরিবর্ত হিসেবে নেমে তিন গোল ও দুইটি অ্যাসিস্ট করে যুদ্ধবিধ্বস্ত এক নিপীড়িত জনজাতির চোখে নতুন স্বপ্ন এঁকে দিয়েছিলেন তিনি। ডেনিজকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল এক আবেগঘন রূপকথা।
কিন্তু ফুটবল বড়ই নিষ্ঠুর। এখানে পরিসংখ্যান অনেক সময় আস্ত একটা মরীচিকা ছাড়া আর কিছুই নয়! প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে নকআউটের মরণবাঁচন ম্যাচে ডেনিজের সেই রূপকথা নিমেষেই পরিণত হল এক ঘোর দুঃস্বপ্নে। জামাল মুসিয়ালার মতো প্রতিভাকে বেঞ্চে বসিয়ে কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান এদিন ফিফার ‘এক নম্বর’ ডেনিজকে প্রথম একাদশে সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু প্যারাগুয়ের শারীরিকভাবে জমাট ও রুক্ষ রক্ষণের সামনে জার্মানির এই নতুন নায়ক যেন আক্ষরিক অর্থেই উবে গেলেন। ল্যাপটপের ডেটা আর বাস্তবের ঘামের গন্ধের যে বিস্তর ফারাক, তা যেন প্রতি মুহূর্তে স্পষ্ট হচ্ছিল।
৬ মিনিটে একটা সহজ সুযোগ নষ্ট করার পর থেকে পুরো মাঠে তাঁকে আর খুঁজেই পাওয়া গেল না। কাই হাভার্জের সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া ছিল চূড়ান্ত হতাশাজনক। যে ডেটার ওপর ভিত্তি করে ফিফা তাঁকে সেরার মুকুট পরিয়েছিল, সেই ডেটাই বলছে-৬৩ মিনিট মাঠে থেকে ডেনিজের ‘শটস অন টার্গেট’ শূন্য, সফল ড্রিবল শূন্য এবং ডুয়েলে জয়ও শূন্য! জার্মান সংবাদমাধ্যমগুলি তাঁকে ১০-এর মধ্যে মাত্র ৩ নম্বর দিয়ে ‘অদৃশ্য’ তকমা সেঁটে দিল। শেষপর্যন্ত ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে ৬৩ মিনিটেই মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে।
ডেনিজের এই পতন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হয়েই থাকল না, গোটা জার্মানির জন্যই তা এক ঐতিহাসিক পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াল। ১-১ গোলে অমীমাংসিত থাকার পর, টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেল চারবারের চ্যাম্পিয়নরা। জোনাথন তাহর একটি বাতিল হওয়া গোল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, দিনশেষে চরম সত্য হল-বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথমবার টাইব্রেকারে হারল পেনাল্টি বিশেষজ্ঞ জার্মানি! আর ফুটবল বিধাতাও বোধহয় মুচকি হেসে বুঝিয়ে দিলেন, ফিফার খাতায় তুমি এক নম্বর হতে পারো, কিন্তু সবুজ ঘাসের লড়াইয়ে হৃদয় আর স্নায়ুর জোর না থাকলে, ওই পরিসংখ্যানের পাতা ধুলোয় মিশে যেতে এক মুহূর্তও সময় লাগে না।

