দখল বনাম উচ্ছেদ

দখল বনাম উচ্ছেদ

শিক্ষা
Spread the love


জবরদখল অন্যায়। সরকারি জমি গ্রাস বেআইনি। এতে কোনও সন্দেহ নেই। অবৈধ সবকিছুই আইনবিরুদ্ধ। সমস্তরকম অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারি পদক্ষেপ তাই স্বাভাবিক। ভারতের নানা প্রান্তে দখলদারি একটি বিরাট সমস্যা। রেলের জমিতে বসতি, স্টেশনে দোকান, পূর্ত দপ্তরের জায়গায় নির্মাণ, বাজার বা বনের জন্য নির্ধারিত জমিতে বসবাস, নদীর চরে আবাদ বা ঘরবাড়ি চারদিকে দেখা যায়। এগুলো সবই জবরদখলের পর্যায়ে পড়ে।

তবে নিয়ম ভেঙে এত নানারকম তৎপরতা অনেক মানুষের পেটে ভাত জোগায়। কেউ দোকান তৈরি, কেউ চাষাবাদ করে সংসার প্রতিপালন করেন। ওই বেআইনি জবরদখলের সঙ্গে অনেক পরিবারের সকলের জীবনের নিশ্চয়তা জড়িত। অনেকের ক্ষেত্রে জীবিকার এই সংস্থান বহু বছরের পুরোনো। হয়তো এরকম অবৈধ দখলের ভিত্তিতে যে জীবিকার ব্যবস্থা হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে শুধু দু’বেলা দু’মুঠোর জোগাড় হয় না, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, চিকিৎসার খরচ ওঠে।

সম্প্রতি বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বেআইনি দখল উচ্ছেদের অভিযান শুরু হয়েছে। বিশেষ করে রেলস্টেশনগুলিকে কেন্দ্র করে যে বসতি ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থা, তার ওপর আঘাত আসছে। এই উচ্ছেদে আমদানি করা হয়েছে উত্তরপ্রদেশীয় বুলডোজার সংস্কৃতি। বিশালাকার ওই যন্ত্রদানবের আঘাতে দখল উচ্ছেদ হচ্ছে ঠিকই। পাশাপাশি ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে অনেকের জীবিকার বা বসবাসের শেষ আশ্রয়টুকু। সব হারিয়ে কপর্দকশূন্য একদল মানুষ রাস্তায় দাঁড়াচ্ছে। যাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

এমন প্রেক্ষাপটে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে, এরকম ভবিতব্য ঠেকাতে সরকার হাত গুটিয়ে থাকবে? বেআইনি দখলকে প্রশ্রয় দেবে? একের পর এক সরকারি জমি দখল হয়ে যাচ্ছে দেখেও চুপ করে বসে থাকবে? বাংলায় প্রথম বিজেপি সরকারের বুলডোজার প্রিয় অভিযানের প্রতি এসব প্রশ্নে অনেকে দু’হাত তুলে সমর্থন করছেন। যাঁরা বিরোধিতা করছেন, উচ্ছেদ অভিযানে বাধা দিচ্ছেন, তাঁদের দেশদ্রোহী তকমা দেওয়া হচ্ছে।

সদ্য যাদবপুর স্টেশন ও সংলগ্ন এলাকায় বুলডোজার আটকানোয় কিছু বামপন্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এর আগে হাওড়া, শিয়ালদা, উত্তরপাড়া, নিউ কোচবিহার স্টেশন এলাকায় একইরকম অভিযান চলেছে। কিন্তু প্রসঙ্গটি যেহেতু জবরদখল কেন্দ্রিক, সেজন্য উচ্ছেদের বিরুদ্ধে তেমন জনমত সংগঠিত হয়নি। সদ্য একটি সরকার রাজ্যে ক্ষমতাসীন হওয়ায় সেভাবে প্রতিবাদে নামতে দোলাচল আছে মানুষের মধ্যে।

চোখের সামনে বছরের পর বছর ধরে এমন এই জবরদখলকে প্রশাসন, রেল দপ্তর কিংবা পুলিশ কেন বরদাস্ত করল- এই প্রশ্নটাও কিন্তু স্বাভাবিক। হঠাৎ করে এত বিস্তীর্ণ জমি বেহাত হয়ে যায়নি। ধীরে ধীরে দখল হয়েছে। অথচ হয় সরকারি কর্তৃপক্ষ চোখ বুজে ছিল, কিংবা প্রশাসন, পুলিশ বা রেল দপ্তরের কেউ কেউ মাসোহারার বিনিময়ে এই বেআইনি দখলকে একরকম বৈধতা দিয়ে এসেছে। জবরদখল উচ্ছেদ হলেও তাঁদের বিরুদ্ধে কিন্তু কোথাও কোনও পদক্ষেপ হচ্ছে না।

যে দেশে বেকারত্ব আকাশছোঁয়া, কর্মসংস্থানের যথাযথ ব্যবস্থা নেই, সরকারি-বেসরকারি চাকরির তেমন বন্দোবস্ত নেই, সেখানে যে কোনও মূল্যে মানুষের জীবিকার পথ তৈরি করে নেওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। পরিত্যক্ত কিংবা ফাঁকা সরকারি জায়গা এভাবে দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকার উপায় হয়ে উঠেছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্টেশনে চা বিিক্রর কাহিনী এপ্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতেই পারে।

উচ্ছেদের বিষয়টি আইনানুগ নিশ্চয়ই। কিন্তু গোটা বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা জরুরি। রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারের অভিযানে কিন্তু সেই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হচ্ছে না। নিশ্চয়ই আর যাতে সরকারি সম্পত্তি বেদখল না হয়, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। কারও পেটে লাথি মারা হলে তা হবে মানবতা বিরোধী। মুখে অন্ন তুলে দিতে না পারলে শুধু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে জনস্বার্থ বিরোধী।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *