সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, মায়ামি: তিনি বৃদ্ধ হলেন! বনস্পতির মতো সারাজীবন গোটা ইউরোপকে একাই ছায়া দিয়ে গেলেন, আর আজ তিনি নিজেই ক্লান্ত। নাহলে বুক দিয়ে চেস্ট ট্র্যাপ করতে গিয়ে বল ওভাবে ছিটকে বেরোয়? রহিম আলি বা ফারুক চৌধুরীদের ক্ষেত্রে এমনটা হলে মানা যায়, কিন্তু তিনি যে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো (Cristiano Ronaldo)! ফুটবল বিশ্বের সেই অতিমানব, যিনি লাতিন আমেরিকার জাদুকরের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দশকের পর দশক লড়াই করেছেন। তাঁর পা থেকে যখন বল ফসকে যায়, তখন বড্ড আপন মনে বেজে ওঠে, ‘ফুরাল যে বেলা।’
প্রথম ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর বিরুদ্ধে নিষ্প্রভ থাকার পর, উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে আশা জাগিয়েছিলেন। কিন্তু শনিবার রাতে মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে গোলশূন্যর পর, ফের কাঠগড়ায় ৪১ বছরের রোনাল্ডো। শুধু গোলশূন্য ড্র নয়, গোটা ম্যাচেই পর্তুগাল কার্যত নিজেদের ছায়া হয়ে রইল। সত্যি বলতে, ম্যাচটা তো কলম্বিয়ারই জেতার কথা। ডাভিনসন স্যাঞ্চেজের করা শেষমুহূর্তের গোলটা ভিএআরে বাতিল হল ঠিকই, কিন্তু না হওয়াই বোধহয় ফুটবলের জন্য উচিত ছিল। প্রযুক্তির দোহাই দিয়ে বুটের ডগা সামান্য বেরিয়ে থাকার জন্য যদি গোল বাতিল করে দিতে হয়, তাহলে ফুটবলের মাধুর্য আর থাকে কোথায়? খোদ ওয়েইন রুনি পর্যন্ত বিবিসি স্টুডিওতে বসে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বললেন, ‘আমার মতে এটা গোল। প্রযুক্তি কী বলছে আমি শুনতে রাজি নই।’ আর কলম্বিয়ার কোচ নেস্টর লোরেঞ্জো তো রসিকতা করেই বসলেন, ‘পরের ম্যাচের আগে স্যাঞ্চেজকে একজন পডোলজিস্টের (পায়ের ডাক্তার) কাছে পাঠাতে হবে, যাতে বুটের ডগাটা ঠিক থাকে!’ এই ড্রয়ের ফলে গ্রুপ ‘কে’ থেকে রানার্স হয়ে শেষ বত্রিশে গেল পর্তুগাল, যেখানে তাদের সামনে অপেক্ষা করছে গত দুই বিশ্বকাপের অন্যতম চমক- লুকা মডরিচের ক্রোয়েশিয়া। ৩ জুলাই টরন্টোয় এই দুই ফুটবল মহীরুহের যে কোনও একজনের বিশ্বকাপের স্বপ্ন চিরতরে শেষ হতে চলেছে।
মায়ামির এই ম্যাচে নামার আগেই কিন্তু মাঠের বাইরে হেরে ভূত হয়ে গিয়েছিল পর্তুগাল। সন্ধে সাতটায় ম্যাচ, অথচ দুপুর দুটো থেকেই স্টেডিয়ামের চারপাশটা যেন সর্ষেখেত! কলম্বিয়ান সমর্থক আর সুন্দরীদের হলুদ জার্সির প্রবল জলোচ্ছ্বাসের মাঝে দুই-একটা মেরুন জার্সি দূরবিন দিয়ে খুঁজতে হচ্ছিল। আর মাঠের ভেতরে? গোটা ম্যাচে কলম্বিয়া যেখানে ২৪টা সুযোগ তৈরি করেছে, পর্তুগাল সেখানে মাত্র ১৩ বার বিপক্ষের বক্সে ঢুকতে পেরেছে! রবার্তো মার্টিনেজের কোনও প্ল্যান ‘বি’ নজরেই আসেনি। সবচেয়ে বড় কথা, রোনাল্ডো খেলতে পারছেন না দেখেও কোচ হিসেবে তাঁকে বসানোর সাহসটুকু দেখাতে পারলেন না তিনি। লিওনেল স্কালোনি যেখানে লিওনেল মেসিকে এবং নরওয়ে আর্লিং ব্রাউট হ্যালান্ডকে তৃতীয় ম্যাচে বিশ্রাম দিল, সেখানে মার্টিনেজ ৪১ বছরের রোনাল্ডোকে টানা তিনটি ৯০ মিনিটের ম্যাচ খেলালেন। সাংবাদিক সম্মেলনে গালভরা যুক্তি দিয়ে তিনি বললেন, ‘কারও সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। ক্রিশ্চিয়ানো জানে কখন কোথায় জায়গা নিতে হয়। ওর মানসিক জোর আর শৃঙ্খলাটাই আসল।’
অথচ গোটা ম্যাচে রোনাল্ডো ছিলেন কার্যত অদৃশ্য। একটা শট মাত্র টার্গেটে। অন্যদিকে, ২০১৪ বিশ্বকাপের আবিষ্কার হামেস রডরিগেজ চোট-আঘাত সারিয়ে কলম্বিয়াকে প্রকৃত অধিনায়কের মতোই খেলালেন। একদা রিয়াল মাদ্রিদে সতীর্থ ছিলেন বলে মাঠে নামার সময় রোনাল্ডোর সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেলেও, খেলার সময় রেয়াত করেননি একটুও। পর্তুগালের গোলকিপার দিয়োগো কোস্তাকে মোট ছয়টা সেভ করতে হয়েছে, যা বুঝিয়ে দেয় মাঠে কতটা আধিপত্য ছিল কলম্বিয়ার।
এই ড্রয়ের ফলে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা বনাম পর্তুগালের সেই বহুকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের ম্যাচ আর হচ্ছে না। সব ফুটবল ভক্তকে হতাশ করে শেষ ষোলোয় স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার পথেই এগোচ্ছে পর্তুগাল। এতেই শেষ নয়, কোয়ার্টার ফাইনালে আরেক ইউরোপীয় শক্তি বেলজিয়ামের মুখোমুখি হতে হবে তাদের। তবে যে ফুটবল রোনাল্ডোরা খেলছেন, তাতে আগে রাউন্ড অফ ৩২-এর ক্রেয়োশিয়া ম্যাচ জেতাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। মার্টিনেজ যতই বলুন, ‘আমরা আটটা ম্যাচ খেলতে এসেছি’, এদিনের ফুটবল শুধু তাঁর দেশ নয়, খোদ রোনাল্ডোর জন্যও যেন এক রাশ লজ্জা বয়ে নিয়ে এল। মায়ামির আর্দ্র বাতাসে তাই আজ শুধুই এক বিদায়ি সুরের অনুরণন।

