গৌরহরি দাস ও অমৃতা চন্দ, কোচবিহার ও দিনহাটা : গত ৭ অগাস্ট দিনহাটার নাজিরহাট এলাকায় বিজেপির পঞ্চায়েত সদস্য সহ চারজনের বাড়িঘর ভাঙচুর ও পূরবী বর্মন নামে এক অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে মারধর করার অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। সেই ঘটনায় জাতীয় মহিলা কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে গোটা বিষয়টি জেলা শাসককে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার নির্দেশ পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বুধবার কোচবিহার জেলা শাসকের কাছে সেই নির্দেশিকা এসে পৌঁছেছে।
জেলা শাসক অরবিন্দকুমার মিনা বলেন, ‘নির্দেশে নির্বাচন কমিশন বলেছে, নাজিরহাটের ঘটনার তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে। আমরা খুব শীঘ্রই তা শুরু করব।’
পূরবী বর্মনের বাবা জিতেন বর্মন বলেন, ‘আমাদের সুরক্ষার জন্য এতদিন কেউ এগিয়ে আসেননি। তবে নির্বাচন কমিশনের তরফে ডিএম-কে এমন নির্দেশ পাঠানোয় আমরা ভরসা পাচ্ছি। আশা করি, আমাদের আর অত্যাচারের শিকার হতে হবে না।’
গত ৫ অগাস্ট দলীয় কর্মসূচিতে কোচবিহারে আসার পথে শহর সংলগ্ন খাগড়াবাড়ি এলাকায় বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর গাড়িতে হামলা হয়। ঘটনায় ৪১ জন তৃণমূল নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হতেই জেলাজুড়ে রাজনৈতিক অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে গত ৭ অগাস্ট দিনহাটার নাজিরহাট-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের শালমারা এলাকা অশান্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ, ওইদিন এলাকায় বিজেপির চারজন কর্মীর বাড়িতে চড়াও হয় তৃণমূল কংগ্রেসের একদল কর্মী। ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয় তাঁদের বাড়িঘরে। বাধা দিতে এলে মারধর করা হয় বলে পরিবারের লোকেদের। ঘটনায় গুরুতর আহত হন বিজেপির শক্তিপ্রমুখ জিতেন্দ্র বর্মনের অন্তঃসত্ত্বা কন্যা পূরবী বর্মন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে প্রথমে কোচবিহার মেডিকেলে এবং পরবর্তীতে শিলিগুড়িতে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করানো হয়। সেখানে তিনি এক সন্তানের জন্ম দিলেও তার শারীরিক পরিস্থিতি ঠিক না থাকায় পরবর্তীতে মা ও সদ্যোজাতকে কল্যাণী এইমসে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই ঘটনার জেরে এলাকায় রাজনৈতিক অশান্তি চরমে ওঠে। বিজেপির তরফে তৃণমূলের বিরুদ্ধে লাগাতার অভিযোগ তোলা হয়। এতে সাধারণ গ্রামবাসীদের মনেও আতঙ্ক ছড়ায়। বিষয়টি নিয়ে দিনহাটার সাহেবগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয় আক্রান্ত পরিবারের তরফে। এই পরিস্থিতিতে আক্রান্তদের পাশে দাঁড়াতে গত ১৮ অগাস্ট শালমারায় আসেন জাতীয় মহিলা কমিশনের সদস্য অর্চনা মজুমদার। তিনি নোটাফেলা এলাকায় পৌঁছে জিতেন বর্মন সহ চার কর্মীর বাড়ি ঘুরে দেখেন। আক্রান্ত পরিবারের সঙ্গেও কথা বলেন তিনি। পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, আক্রান্ত বিজেপি কর্মীদের সুরক্ষার বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ করা প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
নাজিরহাট-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের বিজেপি সদস্য যূথিকা বর্মন বলেন, ‘মহিলা কমিশনের হস্তক্ষেপ আমাদের জন্য বড় ভরসা। এর ফলে ভবিষ্যতে গ্রামাঞ্চলে মহিলাদের ওপর রাজনৈতিক আক্রমণ কিছুটা হলেও রুখে দেওয়া সম্ভব হবে।’
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ঘটনায় সম্প্রতি জাতীয় মহিলা কমিশন তাদের রিপোর্ট জমা দিয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে। সেই রিপোর্টে তারা জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত করে ডিএম-কে এক মাসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে হবে। পাশাপাশি পুলিশকে ওই মহিলার নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া ক্ষতিপূরণ বাবদ ওই মহিলাকে ১০ লক্ষ টাকা দিতে হবে। এই অবস্থায় জাতীয় মহিলা কমিশনের এই রিপোর্টের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন জেলা শাসককে এই নির্দেশিকা পাঠিয়েছে।
বিজেপির জেলা সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় চক্রবর্তী বলেন, ‘মহিলা কমিশন যে উদ্যোগ নিয়েছে তাকে সাধুবাদ জানাই। তবে জেলা প্রশাসন অর্থাৎ রাজ্য পুলিশের দ্বারা তদন্তে এই ঘটনার আসল সত্য কতটা সামনে আসবে বা আদৌও আসবে কি না, তা নিয়ে আমরা সন্দিহান।’
তৃণমূলের জেলা সভাপতি অভিজিৎ দে ভৌমিক (হিপ্পি) বলেন, ‘মহিলা কমিশন, নির্বাচন কমিশন, ইডি, সিবিআই, বিজেপি সবই এক সিন্ডিকেট। তদন্তের নির্দেশ পাঠিয়েছে। তদন্ত হোক। সঠিক তদন্ত হলে আসল সত্য সকলের সামনে উঠে আসবে।’
