তন্দ্রা চক্রবর্তী, কোচবিহার: অবশেষে ডিজিটাল সংরক্ষণের পথে কোচবিহার সাহিত্য সভা (Cooch Behar Sahitya Sabha) লাইব্রেরি। গ্রন্থাগারে থাকা ৫৩৯টি শতবর্ষ প্রাচীন পুঁথিকে এবার ডিজিটালি সংরক্ষণ করা হবে। এজন্য কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির সঙ্গে তিন বছরের মৌ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্কৃতিমন্ত্রকের উদ্যোগে দেশজুড়ে প্রাচীন পুঁথি সংরক্ষণের কাজ করছে জ্ঞান ভারত মিশন। সেই প্রকল্পের অধীনেই বিশেষজ্ঞরা কোচবিহারে (Cooch Behar) এসে পুঁথিগুলির ডিজিটালাইজেশনের কাজ করবেন।
ভবিষ্যতে একটি নির্দিষ্ট পোর্টালের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রী ও গবেষকরা ঘরে বসেই এই পুঁথিগুলি দেখতে ও গবেষণার কাজে ব্যবহার করতে পারবেন। এতে যেমন সংরক্ষণ সুনিশ্চিত হবে, তেমনি কোচবিহারের ইতিহাস নিয়ে গবেষণার নতুন দরজাও খুলবে বলে জানালেন গ্রন্থাগারের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি তথা বিটি অ্যান্ড ইভনিং কলেজে সংস্কৃতের অধ্যাপক তাপস পাল।
এই গ্রন্থাগারে প্রায় সাড়ে পাঁচশোর বেশি প্রাচীন পুঁথি রয়েছে। বেশিরভাগই সংস্কৃত ভাষায় লেখা, কিছু বাংলায়। এই পুঁথিগুলির মধ্যে রয়েছে সংস্কৃত ব্যাকরণ, ধর্মশাস্ত্র, মহাভারতের অনুবাদ, মহারাজা প্রাণনারায়ণের সমসাময়িক কিছু পুঁথি, মহাভারতের আদিপর্ব, বিষ্ণুপ্রসাদম, অর্জুন মিশ্রের টিকা সংবলিত পুঁথি সহ বহু দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ। এই পুঁথিগুলির সবক’টিই বর্তমানে ন্যাশনাল মিশন ফর ম্যানুস্ক্রিপ্টের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
গ্রন্থাগারটি প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে বৃহস্পতিবার সেটি বন্ধ থাকে। সেই অর্থে সাধারণ পাঠকের আনাগোনা কম হলেও ইদানীং গবেষকদের ভিড় বাড়ছে বলে জানান তাপস। বর্তমানে পুস্তক ও পুঁথির দায়িত্ব তাঁর কাঁধেই রয়েছে।
শিলচর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সহ বিদেশ থেকেও প্রচুর গবেষক গ্রন্থাগারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। গ্রন্থাগারের সেক্রেটারি সিদ্ধার্থ সান্যাল জানান, কিছুদিন আগে উজবেকিস্তান থেকে একজন গবেষক এসে বৈষ্ণব ব্যাকরণের ওপর গবেষণার কাজ করে গিয়েছেন। আয়ুর্বেদের ওপর কাজ করার জন্য কানাডা থেকে এক গবেষক লাইব্রেরিতে মেল করেছেন। এছাড়া পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি সায়েন্সের ছাত্রছাত্রীরাও নিয়মিত যোগাযোগ করছেন। তবে একটা গ্রন্থাগার চালাতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, সেই অর্থের জোগান না থাকায় সমস্যার মুখে পড়তে হয়। কোনওরকম সরকারি সাহায্য না মেলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিদ্ধার্থ।
১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে কোচবিহারের মহারাজা জিতেন্দ্রনারায়ণ এবং মহারানি ইন্দিরা দেবীর উৎসাহে কোচবিহারের প্রাচীন সম্পদ উদ্ধার, সংরক্ষণ এবং প্রকাশের উদ্দেশ্য নিয়ে কোচবিহার সাহিত্য সভা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন প্রিন্স ভিক্টর নিতেন্দ্রনারায়ণ। একসময় বহু দুষ্প্রাপ্য পুঁথি সহ নানা ধরনের দুষ্প্রাপ্য মুদ্রা ও ঐতিহাসিক নিদর্শন এই লাইব্রেরিতে ছিল। পরবর্তীতে বহু জিনিসের আর খোঁজ মেলেনি। যা আছে, সেটুকুই যত্ন করে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন সদস্যরা। তা সত্ত্বেও পুঁথিগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যা যা করণীয়, তাঁরা তা নিয়মিত করতেন। প্রাচীন পুঁথিগুলির ডিজিটালাইজেশন জরুরি হলেও, তা করার মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না তাঁদের। এবার সরকারি উদ্যোগে সেই স্বপ্নই পূরণ হতে চলেছে।

