অমৃতা দে, দিনহাটা: বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে খবর প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেশ ছাড়লেন কোচবিহারের (Cooch Behar) দিনহাটা (Dinhata)-২ ব্লকের তৃণমূল পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য কৃষ্ণা কাবেরী বর্মনের বাবা ও মা। রবিবার তাঁরা চ্যাংরাবান্ধা ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে বাংলাদেশে চলে যান। এরপরই প্রশ্ন উঠছে, তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই এভাবে দ্রুত দেশত্যাগ কি কাকতালীয়, নাকি সম্ভাব্য তদন্ত এড়ানোর চেষ্টা?
ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা গিয়েছে, সস্ত্রীক নিতাইচন্দ্র বর্মন বাংলাদেশে প্রবেশের সময় দীর্ঘক্ষণ জেরার মুখে পড়েন। জেরার সময় তিনি স্পষ্টভাবে দাবি করেন, তিনি বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলার বাসিন্দা। তবে দিনহাটায় তাঁর কোনও জমি নেই, কোনও আত্মীয়ও নেই বলে দাবি করেছেন। এমনকি ভারতে দিনহাটার (Dinhata Information) ভোটার তালিকায় তাঁর নাম থাকার অভিযোগও অস্বীকার করেন। এদিকে, তাঁর স্ত্রী নিজেকে নিভারানি বর্মন নয়, স্নেহ বর্মন বলে পরিচয় দেন। নাম ও পরিচয়ে এই বিভ্রান্তি সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে। এদিকে, এ বিষয়ে জানতে এদিন তৃণমূল পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য কৃষ্ণা কাবেরী বর্মনকে বহুবার ফোন করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
যদিও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিতাইচন্দ্র বর্মন ও তাঁর স্ত্রীর পাসপোর্ট ও ভিসা বৈধ এবং ভিসার মেয়াদ এখনও রয়েছে। তাই তাঁদের আটকানোর আইনি সুযোগ ছিল না। তবে ইমিগ্রেশন কর্তাদের জেরায় উঠে আসা দিনহাটার সঙ্গে যোগসূত্র সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়টি কলকাতার বিদেশি আঞ্চলিক নিবন্ধন অফিস (এফআরআরও)-এ জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে মেখলিগঞ্জের এসডিপিও আশিস পি সুব্বা বলেন, ‘ভিসা ও পাসপোর্ট বৈধ থাকলেও দিনহাটার সঙ্গে তাঁদের যোগসূত্র সংক্রান্ত অভিযোগগুলি এফআরআরও-কে জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে তাঁরা ভারতে প্রবেশ করতে পারবেন কি না বা কোনও আইনি পদক্ষেপ করা হবে কি না, তা কেন্দ্রীয় সংস্থার নির্দেশ অনুযায়ী ঠিক হবে।’
এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, নিতাইচন্দ্র বর্মন ও তাঁর পরিবার দিনহাটা শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডে বেশ কয়েক বছর ধরেই বসবাস করছিলেন। দিনহাটা শহরের কলেজপাড়া এলাকায় ১ নম্বর ওয়ার্ডে কয়েক বছর আগে জমি কিনে থাকতে শুরু করেছিলেন নিতাই বর্মনের পরিবার। নিতাই বর্মন বাংলাদেশে চলে যাওয়ার পর তাঁর বাড়িতে গিয়ে কথা হয় বড় ছেলে হিমাংশুরঞ্জন বর্মনের সঙ্গে। জানা যায়, হিমাংশু (৩২) ও তাঁর ভাই উৎপল বর্মন (২৭) দুজনেই দিনহাটার ৩০৫ নম্বর বুথের ভোটার। হিমাংশু দাবি করেন, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর বাবা নিতাইচন্দ্র বর্মনের নাম আছে। তবে হিমাংশু স্বীকার করেন, তাঁরা বাংলাদেশ থেকেই এসেছিলেন, যদিও বহু বছর আগে। দিনহাটার বিভিন্ন স্কুলে তাঁদের পড়াশোনা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত প্রশ্নে তিনি মন্তব্য এড়িয়ে যান।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠে আসছে, যে ব্যক্তি ইমিগ্রেশন চেকিংয়ের সময় নিজেকে বাংলাদেশের নাগরিক বলে দাবি করছেন, তিনি ও তাঁর পরিবার কীভাবে দিনের পর দিন দিনহাটা ১ নম্বর ওয়ার্ডে বসবাস করলেন? কীভাবে ২০০২ সাল থেকেই নিতাইচন্দ্র বর্মন ও তাঁর স্ত্রী নিভারানি বর্মনের নাম ভোটার তালিকায় থেকে গেল? দীর্ঘ প্রায় ২৩ বছর ধরে কীভাবে একই পরিবার দুই দেশের নাগরিকত্বের সুযোগ ভোগ করল, এই প্রশ্নগুলির কোনও স্পষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি। এই প্রসঙ্গে দিনহাটা ১ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল নেতা জয়দীপ ঘোষ বলেন, ‘ওই পরিবার বাংলাদেশি, এই অভিযোগ আগেও উঠেছে। তাঁরা বহু বছর ধরেই এখানে রয়েছেন। অভিযোগের কতটা সত্যতা আছে, তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব প্রশাসনের। আমাদের কিছু করার নেই।’
এ বিষয়ে উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদয়ন গুহ (Udayan Guha) বলেন, ‘নাগরিকত্ব নির্ধারণ সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রের বিষয়। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম থাকলে তা তৃণমূল আমলের আগে। রাজ্য সরকারকে দোষারোপ করা ঠিক নয়।’ তিনি বলেন, ‘নিতাই বর্মনের সন্তানদের এসসি সার্টিফিকেট রয়েছে। নিশ্চয়ই যথাযথ নথিপত্র যাচাই করেই তা ইস্যু হয়েছে। ২০০২ সালে এসআইআর হয়েছিল। এসআইআর হওয়ার পরে যাঁদের ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে, তাঁরা নিশ্চয়ই নির্বাচন কমিশনকে কনভিন্স করতে পেরেছিলেন, সেই কারণেই তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় আছে।’ অন্যদিকে, সিপিএমের জেলা সম্পাদক অনন্ত রায় এই ঘটনাকে গুরুতর বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর কথায়, ‘এটা নিছক ভুল নয়। এর পেছনে চক্র কাজ করছে। এর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া জরুরি।’
সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, নিতাই বর্মন বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলার বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম নরেন্দ্রনাথ বর্মন, মায়ের নাম যশোদা রানি। তিনি বাংলাদেশ সরকারের চাকরি থেকে দু’বছর আগে অবসর নিয়েছেন। এই তথ্য সত্য হলে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ সরকারের কর্মীর নাম কীভাবে দীর্ঘদিন ভারতের ভোটার তালিকায় থেকে গেল?
