Cooch Behar | তোর্ষাপারে উন্নয়নই তুরুপের তাস

Cooch Behar | তোর্ষাপারে উন্নয়নই তুরুপের তাস

ব্লগ/BLOG
Spread the love


প্রতিটি বিধানসভা এলাকা একেকটি জীবন্ত জনপদ। তার নিজস্ব রসায়ন আছে। একেক বিধানসভায় রাজনীতির বোঝাপড়া একেকরকম। ভোটের আগে প্রতিটি বিধানসভার সেইসব গোপন রাজনৈতিক রসায়নের কথা তুলে ধরছে উত্তরবঙ্গ সংবাদ

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, কোচবিহার: ঘুঘুমারির কদমতলা মোড়। দুই যাত্রীর সঙ্গে তুমুল তর্ক জুড়েছেন টোটোচালক। মোড়ের মধ্যে টোটো দাঁড়িয়ে থাকায় আরও কয়েকটি টোটো ও গাড়ি আটকে পড়েছে। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই কারওই। হর্ন দিয়েও কাজ হচ্ছে না। কাছে যেতেই বোঝা গেল ভাড়া নিয়ে ঝামেলা। আঙুল উঁচিয়ে এক যাত্রী বলছেন, ‘আগে রাস্তা ভাঙাচোরা ছিল। তখন আমরা ২০-২৫ টাকা দিতাম। এখন তো রাস্তা ঝাঁ চকচকে। এখন যা ভাড়া (অর্থাৎ ১০ টাকা) তাই নিতে হবে।’ সেই যুক্তি অবশ্য মানতে নারাজ টোটোচালক। তিনি কিছুতেই ২৫ টাকার কমে যাবেন না। রাগে গজগজ করতে করতে ধাক্কা দিয়ে টোটো এগিয়ে দিলেন যাত্রীটি। অন্যদের উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘সরকার রাস্তা তো বানিয়ে দিল। কিন্তু টোটোর ভাড়া এখনও ঠিক করতে পারল না।’

শুধু পশারিহাটের রাস্তাই নয়, কোচবিহার (Cooch Behar) দক্ষিণ বিধানসভা এলাকায় থাকা ন’টি গ্রাম পঞ্চায়েতে কয়েক ডজন রাস্তা সারাই হয়েছে গত পাঁচ বছরে। না, তাতে অবশ্য স্থানীয় বিজেপি (BJP) বিধায়কের কৃতিত্ব নেই। কৃতিত্ব আদতে রাজ্য সরকারের। শাসকদল তৃণমূলের (TMC) কোচবিহার জেলা সভাপতি অভিজিৎ দে ভৌমিক (হিপ্পি) ২০২১-এর নির্বাচনে ওই কেন্দ্রে পরাজিত হয়েছেন বিজেপির নিখিলরঞ্জন দে’র কাছে। ২০২৬-এর নির্বাচনে তিনিই ওই কেন্দ্রের সম্ভাব্য প্রার্থী হবেন ধরে নিয়েই গত পাঁচ বছরে ঘর গুছিয়েছেন হিপ্পি। সাম, দাম, দণ্ড, ভেদ প্রয়োগ করে পরিকল্পনামাফিক মন্ত্রীদের কাছে দরবার করে কোচবিহার দক্ষিণ বিধানসভা এলাকায় রাজ্য সরকারের নানা উন্নয়ন প্রকল্পে দেদার কাজ করিয়েছেন। জেলা তৃণমূলের অন্দরে একথা কেউ অস্বীকার করে না যে, মন্ত্রী হয়েও উদয়ন গুহর নির্বাচনি এলাকা দিনহাটায় যত কাজ হয়েছে তার চাইতে অনেক বেশি কাজ হয়েছে কোচবিহার দক্ষিণ বিধানসভা এলাকায়। হারের পরও উন্নয়নের গতি না থমকানোই এবার এলাকায় নির্বাচনি সমীকরণ তৈরি করবে।

কোচবিহার-১ ব্লকের ন’টি গ্রাম পঞ্চায়েত এবং কোচবিহার পুরসভা নিয়ে কোচবিহার দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র গঠিত। পদ্ম শিবিরের বিজয়ী সেনাপতির বিরুদ্ধে এলাকায় ভালোই ক্ষোভ রয়েছে। বিধায়ককে তৃণমূল কায়দা করে কাজ করতে দেয়নি, এলাকায় ঢুকলেই হামলা চালিয়েছে- এমন অভিযোগ বহু আছে। কিন্তু সেসব প্রতিরোধ করে বিজেপির মানুষের কাছে পৌঁছোনোর চেষ্টায় যথেষ্ট খামতি থেকে গিয়েছে। এলাকায় ঘুরলেই তার আঁচ মেলে। চিলকিরহাট, পাটছড়া, চান্দামারি, ফলিমারি, ঘুঘুমারির একাংশে একসময় বিজেপির ভালো প্রভাব ছিল। গত কয়েক বছরে সেই অর্থে ওইসব এলাকায় তেমন কোনও দলীয় কর্মসূচিই হয়নি। তৃণমূলের হাতে আক্রান্ত কর্মীদের ভরসা দিতে এলাকায় গিয়ে পড়ে থাকেননি কোনও নেতা। ফলে নিজেদের বাঁচাতে এবং অভিমানে বিজেপির একটা অংশ নাম লিখিয়েছে ঘাসফুল শিবিরে। তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

গত পাঁচ বছর আগে জনমত যখন গেরুয়া আবির উড়িয়েছিল, তখন মানুষ চেয়েছিল এমন এক অভিভাবক যিনি বিপদে-আপদে ছায়া দেবেন। কিন্তু অভিযোগের পাহাড় বলছে, বিজয়ী বিধায়ক নিখিলরঞ্জন নিজেকে বন্দি করে ফেলেছেন শহরের নির্দিষ্ট বৃত্তে। প্রান্তিক গ্রামগুলোর রাস্তার সমস্যা বা ভাঙনকবলিত মানুষের চোখের জল তাঁর ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছায়নি। ফলে এলাকায় তোর্ষার মতোই পর্দার আড়ালে বিজেপি-পাড় ভাঙার খেলাটা অনেকদিন ধরেই চলছে।

একসময় বামেদের শক্ত ঘাঁটিতে বিজেপি যে সাংগঠনিকভাবে বিশাল কিছু করেছে তা কিন্তু নয়। বামেদের ভোটের একটা বড় অংশ, বিক্ষুব্ধ তৃণমূল এবং রাজ্য সরকার বিরোধী ভোটের মিলিত অঙ্কেই নিখিলরঞ্জন জয়ী হয়েছেন। তারপরও এলাকায় নেতা তৈরি করতে পারেননি। শুরুতে দিব্যনাথ বর্মনের মতো নেতারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে সংগঠন করলেও বিধানসভার পর সেভাবে তাঁদের আর দেখা মিলছে না। আবার দীপা চক্রবর্তী, বিরাজ বসুর মতো নেতৃত্ব ওই কেন্দ্রে প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে থাকায় গোষ্ঠীকোন্দলের চোরা স্রোত বইতে শুরু করেছে।

তৃণমূলের সার্বিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ তাদের ভোট দেবেন- এই ভাবনাকে কিছু সময়ের জন্য সরিয়ে রাখলে কোচবিহার দক্ষিণ কেন্দ্রে বিজেপির নিশ্চিত ভোটব্যাংক সেভাবে কিছুই নেই। বিজেপির যখন দিশেহারা অবস্থা, ঠিক তখনই উলটো ছবি এঁকেছে তৃণমূল। পাঁচ বছরে নানা সমস্যা মিটিয়ে এলাকায় লাগাতার কর্মসূিচ করে সংগঠন টনটনে করে ফেলেছে শাসকদল। যা বিজেপির জনসমর্থনের ভিত অনেকটাই আলগা করে দিয়েছে।

তা সত্ত্বেও তৃণমূলের রাজনীতির পিচ একেবারে ঝকঝকে নয়। সেখানেও লুকিয়ে আছে সেরাজুল কাঁটা। সংখ্যালঘু ভোটার অধ্যুষিত দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রে শুকটাবাড়ি বরাবরই ফ্যাক্টর। অতীতে অনেক ভোটের হিসেব বদলে দিয়েছে শুকটাবাড়ি। সেই এলাকায় বাহুবলী তৃণমূল নেতা সেরাজুল হক আপাতত দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও তাঁর অনুগামীরা এখনও অনেকের রাতের ঘুম কেড়ে নিতে পারে। রাজনীতির পাটিগণিতে তিনি হয়তো একা কিছুই করতে পারবেন না, কিন্তু তাঁর ভোট কাটার ক্ষমতা যে কোনও শিবিরকে ভাবাতে বাধ্য। দক্ষিণ বিধানসভায় বাম, কংগ্রেস সহ অন্য দলগুলোর খানিকটা ভোট থাকলেও তা ফলাফল ওলটপালট করে দেবার মতো নয়।

গ্রামের বাইরে কোচবিহার শহর বরাবরই একটু অন্য ধাতুতে গড়া। এখানকার মানুষ আবেগ আর যুক্তি দুটোকেই সমান গুরুত্ব দেন। বারবার শহরবাসী যখন ঘাসফুল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে তখন অভিজিৎ খেলেছেন এক কৌশলী চাল। শুধু রাজনীতি দিয়ে মন জয় করা যায় না বুঝে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন সংস্কৃতির। পাঁচ বছর ধরে দুশোটিরও বেশি দল নিয়ে শুরু করেছেন হেরিটেজ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। বছর দুয়েক হল কোচবিহার শহরে শুরু করেছেন জাঁকজমকপূর্ণ হেরিটেজ নাট্যোৎসব। শিক্ষক দিবস পালন করে সাংস্কৃতিক আবহে তিনি শহরের মানুষের নাগরিক আভিজাত্যকে ছুঁতে চেষ্টা করছেন। রুচিশীল এই জনসংযোগ ধীরে ধীরে বরফ গলাতে শুরু করেছে। শহরের যে ড্রয়িংরুমে একসময় তৃণমূল ব্রাত্য ছিল, সেখানে আজ অন্তত তর্কের টেবিলে দলের উপস্থিতি উজ্জ্বল। শহরে ওয়ার্ডভিত্তিক জনসংযোগ এবং পুরসভার কর বৃদ্ধি ইস্যুতে রবীন্দ্রনাথ ঘোষের বিরুদ্ধে গিয়ে ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ানোয় শহরে ২০২১-এর চাইতে অনেক বেশি সুবিধাজনক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে জোড়াফুল শিবির।

সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের ছবি তুলতে ফাঁসিরঘাটে ভিড় জমিয়েছিলেন কিছু উঠতি ফোটোগ্রাফার। তাঁদের লেন্সে প্রকৃতির আলো-ছায়ার খেলা ধরা পড়েছে। কোচবিহার দক্ষিণ বিধানসভার ভোটারদের চোখে রাজনীতির আলো-ছায়া কতটা ধরা পড়বে তা সময়ই বলবে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *