সমীর দাস, কালচিনি: যিনি রাঁধেন, তিনি চুলও বাঁধেন। পেশায় তিনি সিভিক ভলান্টিয়ার (Civic Volunteer)। তবে তাঁর রক্তে মিশে রয়েছে সংগীত। আর সেই তাড়নাতেই তিনি কাজের শেষে ঘরে ফিরে গান লেখেন, সেই গানে সুর দেন। আবার নিজের লেখা, সুর দেওয়া গান নানা অনুষ্ঠানে গেয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন।
কালচিনি চা বাগানের (Kalchini tea backyard) গুদাম লাইনের বাসিন্দা সীমা লোহার। তিনি সাদরিভাষী। হিন্দিমাধ্যমে পড়াশোনা করলেও সাদরি ভাষাকে জীবিত রাখতে গানকেই অস্ত্র করেছেন বছর ৩৬-এর ওই তরুণী। চা বলয়ে ইতিমধ্যেই সীমার লেখা ও গাওয়া গান প্রশংসিত হচ্ছে।
নিজের গানের মাধ্যমেই সাদরি ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার নিরন্তর চেষ্টা করে যান সীমা। সাদরি গানের জগতে যে ক’জন শিল্পী রয়েছেন তাঁদের মধ্যে জনপ্রিয়তার নিরিখে সীমা অনেকটাই এগিয়ে। সারাদিন শত কাজের মধ্যেও সীমার সংগীত প্রীতি তাঁকে অন্য আসনে বসিয়েছে। শুধু গান নয়, সীমা মাদল বাজানোতেও হাত পাকিয়েছেন। তাতেও আসর মাতিয়ে দেন তিনি।
সিভিক ভলান্টিয়ারদের ডিউটি সহজ নয়। কখনও শহরে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, আবার কখনও সড়কের নিরাপত্তা সামলানো। রোদে পুড়ে, জলে ভিজে সারাদিন ডিউটির পর সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন সীমা। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ঢুকে পড়েন তাঁর নিভৃত সংগীত সাধনার জগতে। প্রতিদিন নিয়ম করে এক ঘণ্টা গানের রেওয়াজ করেন। তারপর মাদল নিয়ে বসেন এক ঘণ্টা।
বাড়িতে রয়েছেন বড় দুই দিদি। মাঝেমধ্যে বাড়ির রান্না করতে হয় সীমাকে। এইভাবেই কাটছে তিন বোনের সংসার। তাঁর এক দিদি রূপা লোহার চা বাগানের শ্রমিকের কাজ থেকে অবসর নিয়েছেন। আরেক দিদি সুনীতা লোহার বাগানের শ্রমিক। তবে বাড়ির মূল রোজগেরে সীমাই।
এমন নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ের গানের নেশা হল কীভাবে? সীমার কথায়, ‘বাবা পুষা লোহার কালচিনি চা বাগানের কর্মী ছিলেন। মা দুর্গামণি ছিলেন ওই বাগানের শ্রমিক। জ্যাঠামশাই সুকার লোহার এক সময়ে আকাশবাণীতে সাদরি ভাষায় গান গাইতেন। তাই ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে গানের পরিবেশ ছিল। ছোট থেকেই জ্যাঠামশাইয়ের হাত ধরে মাদল বাজানো আর গানের চর্চা শুরু হয় সীমার। তাঁর প্রয়াত এক দিদি পুনম ছিলেন ডুয়ার্সের সাদরি ভাষার জনপ্রিয় গায়িকা।
তবে সীমার গান লেখার ঝোঁকটা তৈরি হয় অনেক পরে। সীমা বলেন, ‘টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখে একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম, নিজেই গান লিখব। তা ৪-৫ বছর আগের কথা। ইতিমধ্যে ১০টি গান লিখেছি।’ তাঁর লেখায় থাকে আদিবাসী সমাজের নবীন প্রজেন্মর চাওয়াপাওয়া, ভালোবাসার কথা আর সচেতন করার বার্তা। চা বাগানের শ্রমিকদের সুখ-দুঃখের কাহিনী তাঁর গানে জীবন্ত হয়ে ওঠে। আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান নিয়েই তিনি গান লিখেছেন। হোলি উৎসব নিয়ে লেখা তাঁর গান ইতিমধ্যে প্রশংসিত হয়েছে।
কালচিনি ছাড়াও ডুয়ার্সের অনেক চা বাগানে এখন যে কোনও উৎসবে গান গাইতে আর মাদল বাজানোর ডাক আসে সীমার। তবে সবসময় ছুটি পাওয়া যায় না। তাই কাজের চাপে থমকে যায় সংগীত সাধনা।
বিয়ের কথা উল্লেখ করতেই সলজ্জ সীমা বললেন, এখনও তেমন কোনও পাত্র পাইনি। তাই বিয়ে করিনি। তবে আগামীদিনে সংগীত জগতেই ডুবে থাকতে চান সীমা। নিজের গানের মাধ্যমে সাদরি ভাষাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান তিনি।
গত বছর শিলিগুড়ির ফুলবাড়িতে রাজ্য পুলিশের তরফে পুলিশ আইডল সংগীত প্রতিযোগিতায় সীমা সেমিফাইনালে পৌঁছান। কথা বলার ফাঁকেই গুনগুন করে শোনালেন নিজের লেখা গান- ‘সোনা কে দিন উগা, সোনা কে দিন উগা/ হামরে হেইকে ভারতবাসী সোনাকে দিন উগা’ (সোনার মতো দিন ফিরিয়ে আনো তোমরা সবাই। আমরা ভারতবাসী, তাই দেশকে সোনার মতো গড়ে তুলতে হবে আমাদেরই)।
কোথাও যেন সীমার কাজের আদর্শ আর গানের ভাষা মিলেমিশে এক হয়ে যায়।

