CID Probe | মাদক মামলায় অভিযুক্তদের জামিন পাইয়ে দিতে সিন্ডিকেট! তদন্তে সিআইডি

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : তৃণমূল আমলে হাইকোর্টে তথ্য জালিয়াতি করে ১২৬টি মাদক মামলায় অভিযুক্তদের জামিন পাইয়ে দিতে পুলিশ, মাদক পাচারকারী এবং আইনজীবীদের একাংশের তৈরি সিন্ডিকেটের কালো কারবার নিয়ে তদন্ত শুরু করল সিআইডি। হাইকোর্টের নির্দেশে সম্প্রতি জলপাইগুড়ি কোতোয়ালি থানায় একটি এফআইআর দায়ের করেছেন সিআইডির উত্তর বিভাগের স্পেশাল সুপারিন্টেন্ডেন্ট অফ পুলিশ অরিশ বিলাল। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের একাধিক ধারায় অজ্ঞাতপরিচয় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়েছে।

এফআইআরে অভিযোগ করা হয়েছে, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে একাধিক থানায় কেস ডায়েরি তৈরি, সংরক্ষণ, প্রতিলিপি তৈরি এবং আদালতে পেশ করার ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে, যার ফলে মাদক মামলায় অভিযুক্তদের জামিন পাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে। সিআইডির অতিরিক্ত ডিরেক্টর জেনারেলের তত্ত্বাবধানে গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দলকে এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।

সূত্রের খবর, প্রাথমিকভাবে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, মাদক পাচারকারীদের জামিন পাইয়ে দিতে মামলার গুরুত্বপূর্ণ নথি সুপরিকল্পিতভাবে গায়েব করা হয়েছিল। একাধিক থানায় তৈরি কেস ডায়েরিতে ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন করা হয়েছিল। আর সেই কারসাজির পিছনে পুলিশকর্মীদের একাংশের সঙ্গে তৎকালীন সরকারি আইনজীবীদের অনেকেই যুক্ত ছিলেন। শতাধিক জামিনের মামলায় এনডিপিএস আইনের বাধ্যতামূলক বিধি না মানার ঘটনা যে নিছক গাফিলতি নয় সেবিষয়ে একপ্রকার নিশ্চিত সিআইডি আধিকারিকরা।

জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের দায়িত্বে থাকা রাজ্যের অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাডিশনাল অ্যাডভোকেট জেনারেল জাগৃতি মিশ্রর বক্তব্য, ‘হাইকোর্টে তথ্য জালিয়াতির মতো মারাত্মক বেআইনি কাজ হয়েছে। সিআইডি তাদের মতো তদন্ত শুরু করেছে। সেই রিপোর্ট জমা হলেই আইন মেনে পরবর্তী পদক্ষেপ হবে।’

মাদক সংক্রান্ত অপরাধ দমনের জন্য দেশে এনডিপিএস বা ‘নার্কোটিক ড্রাগস অ্যান্ড সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস অ্যাক্ট’ রয়েছে। এটি অত্যন্ত কড়া একটি আইন, যেখানে সহজে জামিন মেলার কোনও সুযোগ নেই। কিন্তু এই আইনের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ হল ৪২ এবং ৫২ নম্বর ধারা। ৪২ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনও পুলিশ আধিকারিক যখন গোপন সূত্রে মাদক পাচার বা মজুতের কোনও খবর পান, তখন তল্লাশিতে যাওয়ার আগে তাঁকে সেই তথ্যটি অবিলম্বে নিজের ডায়েরিতে লিখিতভাবে নথিভুক্ত করতে হয় এবং দ্রুত তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তা জানাতে হয়। এর মূল কারণ হল পুলিশি তল্লাশির স্বচ্ছতা বজায় রাখা। যাতে কোনও পুলিশ আধিকারিক ব্যক্তিগত আক্রোশে মিথ্যা মামলা সাজাতে না পারেন, অথবা বাজেয়াপ্ত হওয়া মাদকের পরিমাণ নিয়ে পরে কোনও কারচুপি করতে না পারেন।

অন্যদিকে, ৫২(১) নম্বর ধারা অনুযায়ী, কাউকে গ্রেপ্তার করার পর যত দ্রুত সম্ভব তাঁকে গ্রেপ্তারের সুনির্দিষ্ট কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে হয়। গ্রেপ্তারের কারণ না জানানো হলে, আদালত তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় সেই ত্রুটিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পারে।

তদন্তে দেখা গিয়েছে, বহু মামলাতেই পুলিশ জেনেবুঝেই ৪২ এবং ৫২(১) ধারা অনুযায়ী পদ্ধতি মেনে কাজ করেনি। এমনকি মামলার নথি বা কেস ডায়েরির মধ্যেও এই সংক্রান্ত কোনও কাগজপত্র রাখা হয়নি। সুপ্রিম কোর্টেরও স্পষ্ট নির্দেশিকা রয়েছে যে এই ধারাগুলো না মানলে মামলা টিকবে না। ফলে আদালতে যখন বিচারপতি নথিপত্র দেখতে চান, তখন নির্দিষ্ট কাগজগুলোর অভাবেই গ্রেপ্তারি প্রক্রিয়াটি বেআইনি বলে গণ্য হয়। আর ঠিক এই ফাঁক গলেই ভয়ংকর সব মাদক পাচারে অভিযুক্তরা খুব সহজেই আদালত থেকে আইনি পথে জামিন পেয়ে যাচ্ছিলেন। অর্থাৎ, পুলিশ সরাসরি কাউকে ছেড়ে দিচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু খাতায়-কলমে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন ত্রুটি রাখছে, যার ফলে আইনি পথেই অপরাধীরা মুক্ত হয়ে যাচ্ছে।

২০২৫ সালের ২০ মে শিলিগুড়ি মেট্রোপলিটান পুলিশের মাটিগাড়া থানায় আবদুল রউফ মোমিনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এনডিপিএস মামলার শুনানিতেই প্রথম প্রশ্ন উঠেছিল। কলকাতা হাইকোর্টের জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চে ওঠা একটি মাদক মামলার জামিনের শুনানিতে বিচারপতি দেবাংশু বসাক নথি গোপনের কারসাজি ধরে ফেলেন। তখনই তিনি রাজ্য পুলিশের উত্তরবঙ্গের এডিজি-কে তদন্ত করে রিপোর্ট জমা দিতে বলেছিলেন। ১ জুলাই সেই রিপোর্ট হাইকোর্টে জমা হয়েছে। তারপর আরও একাধিক রিপোর্ট জমা হয়। তাতে এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুসারে ১২৬টি মাদকের জামিন মামলায় নথি গোপন, বিকৃতি বা জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়েছে।

সরকারি কর্মীদের কেউ কেউ নিজেদের পদমর্যাদার অপব্যবহার করে অভিযুক্তদের বিচার চলাকালীন মুক্ত থাকার অন্যায্য সুবিধা পাইয়ে দিয়ে থাকতে পারেন বলে এফআইআরে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সিআইডি আধিকারিক। বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া থানাগুলোর মাদক মামলাতেই পাচারে অভিযুক্তরা বেশি সংখ্যায় জামিন পেয়েছেন৷ এই অসাধু কারবারে মোটা টাকার লেনদেন হয়েছে বলেও মোটামুটি নিশ্চিত তদন্তকারীরা। সেই টাকার উৎস খোঁজার চেষ্টা করছেন তাঁরা। কালো কারবারে ভারতবিরোধী বাংলাদেশি শক্তির হাত আছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মামলার গ্রেপ্তারকারী আধিকারিক, তদন্তকারী, নথির রক্ষক, আদালতে নথি সরবরাহের দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্বাধীনভাবে অবগত অন্য ব্যক্তিদের ভূমিকা আলাদাভাবে যাচাই করার কাজ শুরু হয়েছে বলেই সিআইডি সূত্রের খবর।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *