প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমানঃ রাতের অন্ধকারে বালি কারবারির ডেরায় চড়াও হয়ে লক্ষাধিক টাকা তোলা চাওয়ার গুরুতর অভিযোগে চার বিজেপি নেতা ও কর্মীকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে (Burdwan BJP Extortion)। পূর্ব বর্ধমানের জামালপুর ব্লকের চৌবেড়িয়া এলাকায় সোমবার গভীর রাতে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ছড়ায়। খবর পেয়ে জামালপুর থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিজেপির জামালপুর ১ নম্বর মণ্ডলের সম্পাদক এবং দুই বুথ সভাপতিসহ চারজনকে দড়ি বাঁধা অবস্থা থেকে উদ্ধার করে। বিরোধী শিবিরের কাছে মুখরোচক খোরাক জোগানো এই ঘটনায় জেলার রাজনৈতিক মহলে চরম শোরগোল পেকেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চৌবেড়িয়া এলাকায় মেমারি-তারকেশ্বর রোডের পাশে বালি মজুত করে ব্যবসা চালাতেন ঘাটের ইজারাদার সৈয়দ নিয়াজউদ্দিন। সোমবার গভীর রাতে সেখান থেকে ট্রাক্টরে বালি লোড করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পাঠানোর কাজ চলছিল। ঠিক সেই সময়ে, অর্থাৎ রাত বারোটা নাগাদ বিজেপির জামালপুর ১ নম্বর মণ্ডলের সম্পাদক বসন্ত পাঁজা, পাঁচড়া গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার দুটি বুথের সভাপতি ভাগ্য ক্ষেত্রপাল, প্রদীপ চৌধুরী এবং অমিত পালকে সঙ্গে নিয়ে ওই স্টক পয়েন্টে গিয়ে উপস্থিত হন।
সেখানেই ইজারাদারের লোকজনের সঙ্গে তীব্র বচসায় জড়িয়ে পড়েন বসন্ত পাঁজা ও তাঁর সঙ্গীরা। বালি কারবারির লোকজনের জোরালো দাবি, ওই চারজন বিজেপি নেতা সেখানে গিয়ে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা চাঁদা বা তোলা দাবি করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ইজারাদার সৈয়দ নিয়াজউদ্দিন সঙ্গে সঙ্গে জামালপুর থানার ওসি এবং স্থানীয় বিধায়ককে ফোন করে পুরো বিষয়টি জানান। এরপর বিধায়কের নির্দেশে মণ্ডলের সভাপতি প্রধানচন্দ্র পাল ও তাঁর লোকজন বালি মজুতের জায়গায় পৌঁছন এবং তোলাবাজির অভিযোগে অভিযুক্ত ওই চারজনকে ধরে ফেলে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখেন।
ইজারাদার সৈয়দ নিয়াজউদ্দিন জানিয়েছেন, জেলা ভূমি দপ্তরের অনুমোদিত বৈধ স্টক পয়েন্ট ও চালান দিয়েই ট্রাক্টরে বালি লোড করা হচ্ছিল। অথচ বিজেপি পরিচয়ে গভীর রাতে তাঁর কর্মীদের ওপর চড়াও হয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। তবে তোলা চাওয়ার সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন অভিযুক্ত বিজেপি নেতা বসন্ত পাঁজা। তাঁর দাবি, আঝাপুর থেকে ফেরার পথে বালি বোঝাই ট্রাক্টরের লম্বা লাইন দেখে সন্দেহ হওয়ায় তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন। বালি বৈধ না অবৈধ উপায়ে পাচার হচ্ছিল তা খতিয়ে দেখতে নথি চাইতে গেলে বালি কারবারির লোকজন তর্ক জুড়ে দেয়। এরই মধ্যে প্রধানচন্দ্র পালের পাঠানো প্রায় অর্ধশত লোক সেখানে এসে তাঁদের মারধর করে এবং উলটে লক্ষাধিক টাকা তোলার মিথ্যে অপবাদ দেয়।
এদিকে দলের অভ্যন্তরীণ এই কোন্দল ও কেলেঙ্কারিতে তীব্র অস্বস্তিতে পড়েছে গেরুয়া শিবির। জামালপুরের মণ্ডল সভাপতি প্রধানচন্দ্র পাল লজ্জিত কণ্ঠে স্বীকার করেছেন যে, দলের পদাধিকারী হয়েও গভীর রাতে তোলা তুলতে গিয়ে ওই চারজন হাতেনাতে ধরা পড়েছেন। তাঁদের এই পুরনো তোলাবাজির অভ্যাসের কথা রাজ্য নেতৃত্বকে লিখিতভাবে জানানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, বিজেপির কাটোয়া সাংগঠনিক জেলার সভাপতি স্মৃতিকণা বসুর দাবি, টাকা নেওয়ার কোনো প্রমাণ নেই এবং রাতের অন্ধকারে বালি পাচার হওয়ার খবর তিনি নিজে থানাকে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিধায়ক অরুণ হালদার পালটা প্রশ্ন তুলেছেন যে রাতের বেলা বালির গাড়ি চলার সরকারি কোনো নিষেধাজ্ঞা আছে কি না। একই সঙ্গে তিনি কটাক্ষ করে বলেন, যাঁরা রাতে তোলাবাজি করতে গিয়ে ঝামেলা বাধায়, দল তাদের প্রশ্রয় দিচ্ছে কেন? সবমিলিয়ে এই ঘটনায় বিজেপির অন্দরে অন্তর্কোন্দল ও রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে উঠেছে।

