সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, নিউ জার্সি: নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের আশি হাজার দর্শকের সিংহভাগই তখন হলুদ জার্সির আবেগে ভাসছেন। কিন্তু ২১ মিনিটে ইসমায়েল সাইবারির শট যখন অ্যালিসন বেকারের মাথার ওপর দিয়ে গিয়ে জালে আছড়ে পড়ল, তখন মনে হল মেটলাইফের ওই বিশাল গ্যালারিজুড়ে হঠাৎ কেউ যেন একটা নিস্তব্ধতার চাদর মুড়িয়ে দিয়েছে (Brazil vs Morocco 2026)!
পাশের সিটে বসা দিয়েগো (পদবিটা আর জানা হয়নি) ফিক করে হেসে গম্ভীর মুখে ল্যাপটপে লিখতে শুরু করলেন। তখনও আলাপ জমেনি, তবু সন্দেহ হতেই চেপে ধরলাম। মুখে আঙুল রেখে ইশারায় বোঝালেন তিনি খুশি, তারপর ফিশফিশ করে বললেন, ‘কে বলতে পারে, এবারও আমরা জিতব না?’ ‘আমরা’ মানে যে আর্জেন্টিনা, তা বুঝতে গোয়েন্দা হওয়ার দরকার নেই। শত্রুকে শেষ করতে হলে যে তাকে আগে বুঝতে হয়! ম্যাচ শেষে দিয়েগো সহ একঝাঁক আর্জেন্টাইন সাংবাদিককে দেখলাম বেশ ফুরফুরে মেজাজে প্রেস কনফারেন্সের দিকে এগোচ্ছেন। যাওয়ার সময় একজন বলেই গেলেন, ‘মুই বিয়েন’ অর্থাৎ ‘ভালো হয়েছে!’
মরক্কোর খেলা দেখে এমন লাগারই কথা। আর এই ম্যাচ অন্তত একটা ব্যাপার স্পষ্ট করে দিল-কার্লো আন্সেলোত্তি কোনও ম্যাজিশিয়ান নন। তাঁর ছোঁয়াতেই যে ব্রাজিল রাতারাতি ঝড় তুলবে, এমনটা হল না। বরং, প্রথমার্ধে ব্রাজিলকে দেখে মনে হচ্ছিল, এরা যেন মেজর লিগ সকারের কোনও সাদামাঠা ক্লাব। মাঝমাঠে ক্যাসেমিরো আর ব্রুনো গুইমারেসকে রীতিমতো নাকানিচোবানি খাওয়ালেন মরক্কোর আয়ুব বোয়াদ্দি নামের কৈশোর না পেরোনো এক অচেনা মিডিও। দর্শকাসনে বসে জিনেদিন জিদান নিশ্চয়ই মুগ্ধ হচ্ছিলেন, কারণ এই বোয়াদ্দিকেই তো তিনি ফ্রান্সের হয়ে খেলাতে চেয়েছিলেন!
ব্রাজিল রক্ষণের ভুলত্রুটিগুলি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল অ্যাটলাস লায়ন্সরা। রজার ইবানেজকে কেন আন্সেলোত্তি তাঁর স্বাভাবিক জায়গা সেন্টার ব্যাকের বদলে রাইট ব্যাকে খেলালেন, সেই নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এই ২৭ বছর বয়সিকেই টার্গেট করেছিল মরক্কো। নীল এল আয়নাউয়ের একটা সুযোগ কোনওক্রমে ব্লক হলেও, ব্রাহিম দিয়াজের সেই চোখজুড়ানো থ্রু পাস আর সাইবারির লব-ব্রাজিলিয়ানদের দম্ভ চূর্ণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল।
তবে ব্রাজিলের মান বাঁচালেন সেই একজনই-ভিনিসিয়াস জুনিয়ার। ৩২ মিনিটে গুইমারেসের পাস ধরে বক্সের বাঁদিক থেকে কাট করে তাঁর ডান পায়ের যে বুলেট শট ইয়াসিন বৌনৌকে বোকা বানিয়ে জালে ঢুকল, সেটা এক কথায় অবিশ্বাস্য! ম্যাচ শেষে স্বয়ং কিংবদন্তি রোনাল্ডো যখন তাঁর হাতে ম্যাচের সেরার পুরস্কার তুলে দিলেন, তখন সতীর্থ ডগলাস সান্তোস বলছিলেন, ‘ভিনি একটা জিনিয়াস। ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে ওকে রোখা অসম্ভব।’ কিন্তু মজার ব্যাপার হল, ভিনিসিয়াস নিজে আদৌ খুশি নন। মিক্সড জোনে অনুবাদকের মাধ্যমে তিনি বলেছেন, ‘আমি ইন্ডিভিজুয়াল অ্যাওয়ার্ডের তোয়াক্কা করি না। আমার চাই বিশ্বকাপ। আজ গোল পেলেও, আমরা খুব খারাপ শুরু করেছি। আরও বল হোল্ড করা উচিত ছিল।’
প্রাচীন লাতিন প্রবাদ আছে, ‘ভেনি, ভিডি, ভিসি’-অর্থাৎ এলাম, দেখলাম, জয় করলাম। কিন্তু শনিবারের মেটলাইফে ক্রাউড ফেভারিট ব্রাজিলকে দেখে মনে হল, দলে তাঁদের ‘ভেনি’ তো আছেন, কিন্তু ভিডি বা ভিসি- অর্থাৎ যোগ্য সংগত যদি না থাকে, তবে হেক্সার স্বপ্ন এবারও সেই অধরাই থেকে যাবে।
আন্সেলোত্তির গলায়ও একই হতাশার সুর। সাংবাদিক সম্মেলনে ইতালীয় কোচ বলেছেন, ‘আমি সত্যিই চিন্তিত। আমরা শুরুতে প্রচুর ডুয়েল আর বল পজেশন হেরেছি। মরক্কো ভালো দল। প্রথম ম্যাচ বলেই হয়তো ছেলেরা একটু নার্ভাস ছিল, কিন্তু আমাদের অনেকটা উন্নতি করতে হবে।’
ব্রাজিলের হতাশা যদি এই ম্যাচের একদিক হয়, তবে অন্যদিকটা হল মরক্কোর স্পিরিট। ২০২২ সালের সেমিফাইনালিস্টরা দেখিয়ে দিল, তারা এবারও চমক দিতে প্রস্তুত। কোচ মহম্মদ ওউহাবি তো ড্র করেও খুশি নন, ‘ছেলেরা হতাশ, কারণ ওরা জিততে চেয়েছিল!’ প্রথমার্ধের শেষদিকে লুকাস পাকুয়েতার অ্যাক্রোবেটিক শট বা দ্বিতীয়ার্ধে রাফিনহার শট-বৌনৌয়ের বিশ্বস্ত হাত না থাকলে মরক্কোর গল্পটা অন্যরকমও হতে পারত।
সংযুক্তি সময়ে অ্যালিসনও দুর্ধর্ষ সেভ করে ব্রাজিলকে বাঁচিয়েছেন। তবে মেটলাইফের ওপরে চক্কর কাটা হেলিকপ্টারের পাইলটও হয়তো শেষ বাঁশি বাজার পর ভাবছিলেন, এ কোন ব্রাজিলকে দেখলাম! আগামী শুক্রবার ফিলাডেলফিয়ায় হাইতির বিরুদ্ধে নামার আগে, আন্সেলোত্তিকে যে অঙ্ক কষে অনেক ভুল শুধরে নিতে হবে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
