তারুণ্যের শক্তি বোধহয় একেই বলে। আঠারো বয়সের নেই ভয়…। ভাইরাল ভিডিওতে পুলিশের লাঠির দমাদম আঘাতেও অবিচল এক তরুণকে দেখে তাই মনে হচ্ছিল। সেই তরুণ চিৎকার করে চলেছিলেন, মারুন, মারুন, মেরে ফেলুন। তবুও তিনি জায়গা ছাড়তে নারাজ। পুলিশের চরম বিড়ম্বনার দৃশ্য দেখল নয়াদিল্লির রাজপথ। সেই অস্বস্তি যাতে আর না বাড়ে, সেজন্য এক মহিলা পুলিশকর্মী ধাক্কা দিয়ে ওই তরুণকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।
তাতে অবশ্য যৌবনের দূতদের দমানো যায়নি। বরং স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ টনক নড়িয়ে দিয়েছিল দেশের সরকারের। প্রতিশ্রুতি কিছু না দিলেও আলোচনায় বসেছে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে। প্রচলিত বিক্ষোভের বাইরে অন্য এক মাত্রা দিয়েছিল সংসদ অভিযান। ঘটনাচক্রে কর্মসূচিটির ডাক দিয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি নামে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা একটি দল। কিন্তু সেই পার্টির কোনও সংগঠিত শক্তি ছিল না, এখনও নেই।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের যন্ত্রণায় আপামর তরুণ সমাজের কাছে ককরোচ হয়ে উঠেছে একটি আবেগের নাম। যে আবেগে একইসঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে বন্দে মাতরম, ইনকিলাব-জিন্দাবাদ, জয় ভীম ইত্যাদি বিভিন্ন বিপরীতমুখী ধ্বনি। বিভিন্ন কেন্দ্র বিরোধী রাজনৈতিক দল সমর্থন দিলেও যন্তরমন্তরে কয়েকদিন ধরে চলা আন্দোলন ও সংসদ চলো অভিযানে কোনও রাজনৈতিক রং ছিল না। আইসা ও এসএফআই-এর মতো বাম ছাত্র সংগঠন সঙ্গে থাকলেও আপামর ভিড়ের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
বেকারত্বের দূর্বিষহ যন্ত্রণা এবং একের পর এক সর্বভারতীয় পরীক্ষায় দুর্নীতি, প্রশ্ন ফাঁস ইত্যাদিতে একইসঙ্গে হতাশা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়াদিল্লির বুকে এমন অভূতপূর্ব যুব সমাবেশ। যেখানে পুলিশের লাঠির ঘা খেয়ে একাদশ শ্রেণির ছাত্রী বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেছেন, কী এমন দাবি করেছি আমরা? এক বছর পর নিট দেব। আবার প্রশ্নপত্র বিক্রি হয়ে যাবে না- তার গ্যারান্টি কোথায়? এসব প্রশ্ন থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেেক তরুণ প্রজন্ম শামিল হয়েছিল দিল্লির মহাসমাবেশে।
নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে তরুণ সমাজে অসন্তোষ ছড়িয়েছিল দেশজুড়ে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির মুখে বেকারদের আরশোলার সঙ্গে তুলনা সেই অসন্তোষকে আরও উসকে দিয়েছিল। পরিণতিতে ভার্চুয়ালি জন্ম নেয় ককরোচ পার্টি। কিন্তু ছাত্র-যুব সমাজের ক্ষোভ উদ্গিরণের জ্বালামুখটি খুলে দিয়েছিল ওই ঘটনা। ফলে অচিরেই ভার্চুয়াল থেকে বাস্তবের মাটিতে নেমে এসেছিল ককরোচ পার্টি।
সরকার প্রথম থেকে আমল না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় একইসঙ্গে হতাশা, রাগ, বিরক্তি ও ক্ষোভ বাড়তে থাকে তরুণদের। যে কারণে কোনও সংগঠনের দরকার হয়নি। স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণরা নিজেদের পয়সা খরচ করে দলে দলে জড়ো হয়েছিলেন রাজধানীর রাজপথে। যাঁরা যেতে পারেননি, তাঁরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একইদিনে নানা রকম বিক্ষোভের আয়োজন করেছিলেন। তরুণদের সমস্যাকে এখনও গুরুত্ব না দিলে অসন্তোষ যে আগ্নেয়গিরির আকার নিতে পারে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
সাধারণভাবে আজকাল রাজনীতি নিস্পৃহ, অন্যের বিপন্নতায় উদাসীন যুবসমাজ যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তা দেশের শাসক শিবিরের জন্য অশনিসংকেত। তানাশাহি নেহি চলেগা, এমনকি মোদির পদত্যাগের দাবিতে সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট। আন্দোলনকারীদের দাবিমতো কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগে সমস্যার সমাধান হবে না ঠিকই। কেননা, প্রশ্নপত্র ফাঁস বা পরীক্ষায় দুর্নীতির মূল রয়েছে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার গভীরে।
সেই ব্যবস্থার সংস্কার না করে শুধু একজন মন্ত্রীকে সরিয়ে কোনও লাভ হবে না। ক্ষুব্ধ তরুণদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরিবেশটা অন্তত তৈরি করা আশু প্রয়োজন। নচেৎ দেশদ্রোহী, টুকরে টুকরে গ্যাং, শহুরে নকশাল ইত্যাদি আখ্যা দিলে পরিস্থিতি আরও বিগড়ে যেতে পারে। দিল্লির রাজপথে সেই বার্তা দিয়ে গেলেন দেশের তরুণরা। সেই বার্তা তারুণ্যের শক্তির!

