মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, রাঙ্গালিবাজনা: প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের কথা! মাদারিহাটের খয়েরবাড়ির সূত্রধরপাড়ার নেপাল সূত্রধরের ভাই গুরুতর অসুস্থ। রক্তের প্রয়োজন। খবরটা শুনে পাশের মহল্লা মুন্সিপাড়ার রজব আলি ভেবেছিলেন, লোকটাকে রক্ত দিয়ে বাঁচানো প্রয়োজন। তবে আগে রক্তদানের (Blood Donor) অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রথমে একটু ভয়ই পেয়েছিলেন তিনি। এরপর সাহস করে এগিয়ে আসেন রজব। চলতে থাকে একের পর এক রক্তদান। বছর ৬৫-র রজবের ঝুলিতে এখন শতাধিক রক্তদানের রেকর্ড (Blood donation document)।
সেটা ২০০৯ সালের ১২ জানুয়ারি। তখন রজবের বয়স ছিল ৫০ বছর। ওজন ১০০ কেজি। ততদিনে ৫৪ বার রক্তদান করে ফেলেছেন তিনি। তখন সোশ্যাল মিডিয়ার বহুল প্রচলন ছিল না। উত্তরবঙ্গ সংবাদে খবর প্রকাশিত হওয়ায় রজবের পরিচিতি বাড়ে। বিভিন্ন জায়গা থেকে ডাক আসতে থাকে। নানা অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা দেওয়া হয় তাঁকে। রজব জানাচ্ছেন, তাঁর রক্তের গ্রুপ ও পজিটিভ। কৃষির ওপর নির্ভর করে দিন গুজরান করতেন তিনি। এক ছেলে, এক মেয়ে স্ত্রীকে নিয়ে সংসার! পরে রাঙ্গালিবাজনা চৌপথিতে এসে একটি ছোট্ট দোকান দেন। ছেলে মোস্তাক আহমেদ বড় হলে তাঁর হাতেই দোকানের দায়িত্ব সঁপে দেন বাবা। ছেলে ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধি বাড়ান। এরপর ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেন রজব। তবে রক্তদান বন্ধ করেননি। বছর পাঁচেক আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। দু’বার স্ট্রোক করায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। এরপরও একপ্রকার জোর করেই দু’বার রক্তদান করেছেন তিনি। কিন্তু এরপর তাঁর ব্লাড সুগার বাড়ে। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, আর রক্তদান করা চলবে না। রজবের সহধর্মিণী মালেকা বেগম বলছিলেন, ‘রক্তদানের কাজে ওকে আমি কোনওদিনই না করিনি। আমি গর্ব করতাম আমার স্বামীর ভূমিকায়। এই কাজের মাধ্যমে ও বহু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে।’
কাজিপাড়ার বাসিন্দা রজবের প্রতিবেশী ফজলুল ইসলাম বলছেন, ‘রজব আলি সমাজের জন্য একটি বার্তা। এখন যদিও তিনি শারীরিক কারণে রক্তদান করতে পারেন না। তবে রক্তদান শিবিরগুলিতে রজবকে নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। এতে মানুষ অনুপ্রাণিত হবেন।’
তবে রজব এখন বৃদ্ধ। খুব ধীরে ধীরে হাঁটাচলা করেন। কথা বলতেও কষ্ট হয়। তবে অতীতের কথা তুলতেই তার মুখে হাসি। আড়াই দশকের রক্তদানের স্মৃতি! অতিকষ্টে টেনে টেনে বললেন, ‘মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি, এতেই আমি খুশি।’ রক্তদান করার পর পাওয়া শংসাপত্রগুলি এখনও ফাইলবন্দি করে রেখেছেন রজব। আর রেখেছেন তাঁকে নিয়ে উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত খবরের পাতাগুলি। রক্তদান করে কখনও কোনও পুরস্কার পাননি? খবরের কাগজের পাতাগুলি হাতে নিয়ে রজব বলছিলেন, ‘এই তো, আমি পুরস্কার পেয়েছি!’
