মোরশেদ হোসেন ও শান্ত বর্মন, বীরপাড়া: মহালয়ার সকালে অঘোষিত লকআউট বীরপাড়া থানার জয়বীরপাড়া চা বাগানে (Birpara Joybirpara Tea Backyard Lockout)! বাগানের সিনিয়ার ম্যানেজার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার শুক্রবার সন্ধ্যায় বাগান ছেড়েছেন। বাগান পরিচালন সংস্থা সূত্রের খবর, দুজনেই ইস্তফা দিয়েছেন। শনিবার সকালে বীরপাড়ায় অ্যাসিস্ট্যান্ট লেবার কমিশনারের দপ্তরের সামনে ভিড় করেন জয়বীরপাড়ার শ্রমিকরা। আবার মালিকপক্ষ কিস্তিতে বোনাস দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ায় ওই অফিসের সামনে ভিড় করেন দলমোড়, ডিমডিমা ও ফালাকাটার তাসাটি চা বাগানের শ্রমিকরা। ওই তিন বাগানের ম্যানেজারকে এদিন অ্যাসিস্ট্যান্ট লেবার কমিশনার অমিত দাস জানিয়ে দেন, কিস্তিতে বোনাসের প্রস্তাবে সরাসরি শ্রম দপ্তর সায় দিতে পারে না। তবে মালিকপক্ষ ও ট্রেড ইউনিয়ন বোঝাপড়া করলে শ্রম দপ্তর হস্তক্ষেপ করবে না।
সব মিলিয়ে প্রবল চাপে বিজেপি ও ভারতীয় টি ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন (বিটিডব্লিউইউ)। পরিস্থিতির চাপে বিটিডব্লিউইউ-র বাগান ইউনিটের নেতারাই সরকার ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। এদিন জয়বীরপাড়ার সমস্যা নিয়ে বীরপাড়ায় ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের কথা ছিল। তবে ম্যানেজাররা ইস্তফা দেওয়ায় বাগানের কেউ আসেননি। অ্যাসিস্ট্যান্ট লেবার কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতীয় টি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির দুই সহ সভাপতি কিশোর বিশ্বকর্মা ও বুদ্ধিমান টিগ্গা, তৃণমূল চা বাগান শ্রমিক ইউনিয়নের সহ সভাপতি শশী সুনওয়াররা।
জয়বীরপাড়ার শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি সমস্যা মেটাতে সম্প্রতি আলিপুরদুয়ারে ডিস্ট্রিক্ট লেবার কমিশনারের দপ্তরে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হয়। বৈঠকে ১৪ অক্টোবর বকেয়া মিটিয়ে দিতে রাজি হলেও এক দফায় ২০ শতাংশ বোনাস দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানায় জয়বীরপাড়া কর্তৃপক্ষ। এনিয়ে শুক্রবার জলপাইগুড়িতে ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের কথা ছিল। পরিচালন সংস্থার অভিযোগ, শুক্রবার বেলা সাড়ে দশটা নাগাদ সিনিয়ার ম্যানেজারের বাংলো দখল করেন একদল শ্রমিক। পরিচালন সংস্থার কর্ণধার রাজা ভট্টাচার্য বলেন, ‘এক মহিলা সহ তিনজন মিলে সিনিয়ার ম্যানেজারকে পুড়িয়ে মারতে উদ্যত হন। প্রাণভয়ে ম্যানেজার এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ইস্তফা দিয়ে চলে যান।’ তিনজনই ভারতীয় টি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের বলে অভিযোগ রাজার। যদিও বুদ্ধিমানের দাবি, ‘কারা হুমকি দিয়েছেন জানি না।’
গত বছরও রাজ্য সরকার ২০ শতাংশ বোনাস ঘোষণা করেছিল। তবে জয়বীরপাড়া কর্তৃপক্ষ ১০ শতাংশ দিতে রাজি হয়। ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে কর্মবিরতি শুরু করেন। ২৭ সেপ্টেম্বর বীরপাড়া থানা ঘেরাও করেন। ১০ অক্টোবর ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে অচলাবস্থা কাটে। এরপরও গত বছরের ৫ শতাংশ বোনাস ও এবছরের ২ পাক্ষিকের মজুরি বকেয়া রয়েছে। পরিচালন সংস্থার কর্ণধার বলছেন, ‘আমি বোনাস এবং মজুরি দিতে চাই। কিন্তু ম্যানেজার এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার নেই। কাজ কারা করবেন?’ সংস্থাটির দাবি, জয়বীরপাড়ায় গত বছর ৮ লক্ষ কেজি চা পাতা উৎপাদিত হলেও এবছর ১ লক্ষ ৪০ হাজার কেজি হয়েছে। ফলে ২০ শতাংশ বোনাস দেওয়া অসম্ভব।
এবিষয়ে বিটিডব্লিউইউ-এর সাধারণ সম্পাদক সাবিন থাপার বক্তব্য, ‘বকেয়া মজুরি এবং বোনাস দিতে হবে বুঝতে পেরে জয়বীরপাড়া কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের সঙ্গে চালাকি করছে।’ শ্রম দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, জয়বীরপাড়ার সমস্যা মেটাতে মঙ্গলবার আলিপুরদুয়ারে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক ডাকা হতে পারে।
শনিবার বীরপাড়ায় শ্রম দপ্তরে বিজেপির চা শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনের বৈঠক হয়। পুজোয় ১২ শতাংশ ও ডিসেম্বরে ৮ শতাংশ বোনাসের প্রস্তাব দেন মালিকপক্ষ। শ্রমিকরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। সন্ধ্যায় ফের বৈঠকে ১৫ শতাংশ বোনাসের প্রস্তাবেও রাজি হননি তাঁরা। সোমবার গেট মিটিং করে পরবর্তী পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শ্রমিকরা। মহিলা শ্রমিক কিরণস্বপ্না ওরাওঁ ও মঞ্জুলা ওরাওঁয়ের দাবি, সরকারি নির্দেশ মেনে অবিলম্বে ২০ শতাংশ বোনাস দিতে হবে।

