নবনীতা মণ্ডল, নয়াদিল্লি: ক্যালেন্ডারের পাতার দিকে আর তাকান না সুইটি বিবি। দিনক্ষণের হিসেব রাখা তিনি ছেড়ে দিয়েছেন। কারণ, দিন গুনলে যন্ত্রণা বাড়ে, কমে না। দিল্লির কে এন কাটজু মার্গ থানার পুলিশের ‘অতিসক্রিয়তা’ আর প্রশাসনিক ঔদাসীন্যে আজ নিজের দেশেই তিনি ‘বিদেশি’। বীরভূমের মেয়ে সুইটি বিবি (Birbhum Lady Citizenship Battle) (৩৩) এবং তাঁর দুই নাবালক সন্তান, কুরবান (৬) ও ইমরান (১২)—গত সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে আটকে। তাঁদের অপরাধ? তাঁরা গরিব, দিল্লিতে শ্রমিকের কাজ করতেন এবং সম্ভবত তাঁদের সবথেকে বড় ‘অপরাধ’—তাঁরা বাংলা ভাষায় কথা বলতেন।
২০২৫ সালের ১৮ জুন। আচমকাই সুইটি, তাঁর পড়শি সুনালি খাতুন ও তাঁদের পরিবারকে তুলে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ (Delhi Police)। অভিযোগের তকমা সাঁটা হয়—‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’। কোনও বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়া নেই, ফরেনার্স ট্রাইবিউনাল নেই, সোজা ‘পুশব্যাক’! মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে, ২৬ জুন তাঁদের জোর করে ঠেলে দেওয়া হয় বাংলাদেশের সীমান্তে। অথচ, এঁরা প্রত্যেকেই পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের স্থায়ী বাসিন্দা। ভারতীয় নাগরিক হয়েও নিজের ভিটেয় ফেরার জন্য আজ তাঁদের চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের দিকে। আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি মামলার পরবর্তী শুনানি।
নাটকের এখানেই শেষ নয়। গত ৫ ডিসেম্বর, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এবং বিএসএফ-বিজিবি ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের পর অন্তঃসত্ত্বা সুনালি খাতুন ও তাঁর ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সুনালি খাতুন দেশে ফিরে সন্তান প্রসব করেছেন, সেই নবজাতকের নাম রেখেছেন সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং। কিন্তু একই অপরাধে অভিযুক্ত সুইটি বিবি কেন ফিরতে পারলেন না? এই দ্বিচারিতায় প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনের সদিচ্ছা নিয়েই।
বর্তমানে বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জে ফারুক শেখ নামের এক ব্যক্তির আশ্রয়ে দিন কাটছে সুইটিদের। ফোনের ওপারে কান্নায় ভেঙে পড়ে সুইটি বলেন, ‘আমি আর দিন গুনি না। ১৮ ফেব্রুয়ারি নাকি আবার শুনানি। আমার ছোট ছেলেটা দেশে একা, আর এই দুই ছেলেকে নিয়ে আমি এখানে বন্দি। এই যন্ত্রণার শেষ কোথায়?’
এই ঘটনা নিছক কোনও প্রশাসনিক ‘ভুল’ নয়, বরং গরিব পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রতি রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মমতার এক জ্বলন্ত দলিল। তথ্যানুসন্ধানে উঠে আসছে এক অদ্ভুত তথ্য—সাধারণত কাউকে বিদেশি তকমা দিতে হলে আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে দিল্লি পুলিশ সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে নিজেদের খেয়ালখুশি মতো ‘পুশব্যাক’ নীতি প্রয়োগ করেছে। সবথেকে বড় তামাশা হল, বাংলাদেশের আদালত—যেখানে তাঁদের অনুপ্রবেশের দায়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল—সেই ভিনদেশের আদালত সুইটিদের আধার কার্ড এবং বীরভূমের জমির দলিল যাচাই করে তাঁদের ‘ভারতীয় নাগরিক’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে! অর্থাৎ, বিদেশের আদালত বলছে তাঁরা ভারতীয়, আর নিজের দেশের পুলিশ তাঁদের ঘাড়ধাক্কা দিচ্ছে।
বীরভূমের (Birbhum) পাইকর গ্রামে সুইটির ভাই আমির খান এখন আদালতের কাগজ বগলে আইনজীবীদের দরজায় ঘুরছেন। সামনে বাংলাদেশে নির্বাচন, তারপর রমজান মাস। আশঙ্কা বাড়ছে পরিবারের। মানবাধিকার সংগঠন এবং বীরভূমের সমাজকর্মী মফিজুল ইসলামদের প্রচেষ্টায় আইনি লড়াই চলছে বটে, কিন্তু প্রশ্ন একটাই—দিল্লির রাজপথে বাংলা ভাষায় কথা বলা কি আজ অপরাধ? তৃণমূল সাংসদ সমীরুল ইসলাম আশ্বাস দিয়েছেন, সুনালির মতো সুইটিকেও ফেরানো হবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই সাত মাসের নরক যন্ত্রণা আর মানসিক ট্রমার ক্ষতিপূরণ কে দেবে?
সব জায়গাতেই এই প্রশ্নটা উঠুক – গরিব বলেই কি নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে গিয়ে ভিনদেশে জেল খাটতে হবে? ১৮ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট কী রায় দেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে গোটা বাংলা। সুইটি বিবির এই অপেক্ষা শুধু তাঁর একার নয়, এটি ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এক বড় প্রশ্নচিহ্ন।
