আজাদ ও শেখ পান্না, মানিকচক ও রতুয়া: জল নেমেছে। কিন্তু স্বস্তি এখনও পুরোপুরি ফেরেনি। বরং ভূতনিতে (Bhutni) জল নামতেই চোখে পড়ছে প্লাবনের আসল ক্ষত। কোথাও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভেতর পুরু বালি-কাদার স্তর, কোথাও নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম। থানা চত্বরেও এখনও জল ও আবর্জনা। তার ওপর মঙ্গলবারের দেড় ঘণ্টার ঝড়ে কেশরপুর বাঁধে আশ্রয় নেওয়া শতাধিক পরিবারের মাথার ওপর থাকা ত্রিপল উড়ে গিয়েছে।
ভূতনির বিশাল অংশ গত সপ্তাহদুয়েক জলের তলায় ছিল। গত কয়েকদিনে জলস্তর কমায় বহু গ্রাম ও রাস্তাঘাট থেকে জল নেমেছে। জলমুক্ত হয়েছে ভূতনি থানা এবং ভূতনি দিয়ারা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এখন সবচেয়ে খারাপ অবস্থা সেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের। পুরো ভবন দীর্ঘদিন জলের তলায় থাকায় নষ্ট হয়েছে বেবি ওয়ার্মার, অটোক্লেভ, ফ্রিজ, জেনারেটর, সিসিটিভি সহ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম। ভেতরে জমে রয়েছে বালি ও কাদার মোটা স্তর। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙাচোরা জিনিসপত্র। ফলে জল নামলেও এখনই সেখানে চিকিৎসা পরিষেবা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
মানিকচকের ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক অভীকশংকর কুমার বলেন, ‘এবারের বন্যা পরিস্থিতি বিগত বছরগুলিকে ছাপিয়ে গিয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পুরো ভবন জলে ডুবে যাওয়ায় যা পরিস্থিতি হয়েছে, তাতে একেবারে নতুন করে সব জিনিস কিনতে হবে। ইতিমধ্যে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’ আপাতত উত্তর চণ্ডীপুর পঞ্চায়েত অফিস থেকেই পরিষেবা দেওয়ার কথা বলেন তিনি। কয়েকদিনের মধ্যেই স্বাস্থ্য ভবনের নির্দেশে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা পরিদর্শনে একটি দল আসবে সেখানে।
থানার ছবিটাও খুব একটা ভালো কিছু নয়। থানা ভবন থেকে জল নেমেছে। কিন্তু বাইরে এখনও জল জমে রয়েছে। চারপাশে জমেছে প্রচুর আবর্জনা। পুলিশ আধিকারিকরা ভবন পরিষ্কারের কাজ শুরু করেছেন। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে থানা চত্বরের জল নেমে যাবে বলে আশাবাদী ভূতনি থানার পুলিশ আধিকারিকরা।
দুর্ভোগ কমেনি কেশরপুর বাঁধেও। মঙ্গলবার দুপুরে আচমকা প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে ঝোড়ো হাওয়া ও বৃষ্টি হয়। তাতে বাঁধে আশ্রয় নেওয়া শতাধিক দুর্গত পরিবারের ত্রিপল উড়ে যায়। কারও মাথার ওপর থাকা ত্রিপল ছিঁড়ে চৌচির। ফলে জল থেকে বাঁচতে বাঁধে উঠে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলির অনেককেই আবার খোলা আকাশের নীচে রাত কাটাতে হবে। রিং বাঁধে আশ্রয় নেওয়া অন্য পরিবারগুলিও ঝড়ের ধাক্কায় ভোগান্তিতে পড়ে। তবে ক্ষতির পরিমাণ কেশরপুর বাঁধেই বেশি। স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য বীরেন মাহাতো বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসনের কাছে একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে। সেই তালিকা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির হাতে ত্রিপল তুলে দেওয়া হবে।’ এর মধ্যেই মঙ্গলবার সকালে গোবর্ধনটোলায় ঘটে যায় নতুন বিপত্তি। নিজের লেদ কারখানায় কাজ করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু হয় সুজন শর্মার (৩২)। পরে ভূতনি থানার পুলিশ দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মালদা মেডিকেলে পাঠায়।
ভূতনিতে যখন জল নামার পরেও ক্ষত সারানোর লড়াই চলছে, তখন প্লাবনে ক্ষতিগ্রস্ত রতুয়ায় ত্রাণ নিয়ে ক্ষোভ সামনে এসেছে। গঙ্গা-ফুলহরের জল কিছুটা কমলেও বিলাইমারি ও মহানন্দটোলা গ্রাম পঞ্চায়েতের একাধিক এলাকায় দুর্ভোগ কাটেনি। মঙ্গলবার সেখানে দুর্গতদের সঙ্গে দেখা করেন কংগ্রেস নেত্রী তথা প্রাক্তন সাংসদ মৌসম নুর। সঙ্গে ছিলেন মানিকচকের প্রাক্তন বিধায়ক মোত্তাকিন আলম এবং রতুয়া-১ ব্লক কংগ্রেসের সভাপতি পরিতোষ সিনহা। তাঁরা বিলাইমারির খাসমহল সহ বিভিন্ন এলাকায় দুর্গতদের কাছে ত্রাণ নিয়ে ক্ষোভের কথা শোনেন। পরে পর্যাপ্ত ত্রাণ এবং নদীভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধানের দাবিতে রতুয়া-১ ব্লক প্রশাসনের দ্বারস্থ হন মৌসম। তাঁর অভিযোগ, ‘বিলাইমারির খাসমহল সহ একাধিক এলাকায় এখনও পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। কোথাও কোথাও বেছে বেছে ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে। ত্রাণ বিতরণে আমরা-ওরা করা হচ্ছে। দুর্গত মানুষকে এভাবে বঞ্চিত করা যায় না।’

