নিতাই সাহা, শিলিগুড়ি: প্রথম দেখায় বন্ধুত্ব, এরপর প্রেম। সেখান থেকে সোজা বিয়ের পিঁড়িতে– এমনই ঘটেছিল ভারতীয় হকি (Hockey) দলের প্রাক্তন অধিনায়ক তথা কালিম্পংয়ের বিজেপি বিধায়ক ভরত ছেত্রীর (Bharat Chettri) জীবনে। বিধায়ক হওয়ার পর ব্যস্ততা কিছুটা বাড়লেও নিজের মতো করে জীবন উপভোগ করতে পছন্দ করেন তিনি। সময় পেলেই রান্না করে স্ত্রী-সন্তানদের খাওয়ান। অবসরে ভালোবাসেন কিশোরকুমারের গান শুনতে।
কালিম্পং (Kalimpong) জেলার ১৬ মাইলের পাইয়ং গ্রামে জন্মেছিলেন ভরত। কৃষক পরিবারের সন্তান। তবে ছেলেবেলা থেকেই হকির প্রতি আকর্ষণ। স্থানীয় রামলাল দাহাল স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা, পরে ভর্তি হন সেন্ট জর্জ স্কুলে। হকিতে হাতেখড়ি সেখানেই। পাহাড়ের পাথুরে মাঠে হকি স্টিক হাতে ছুটে বেড়াতেন। সে সময় বয়স মেরেকেটে ১০ বা ১১। তখন কে-ই বা জানতেন এই ছেলে একদিন দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন? যদিও সব বাধা কাটিয়ে তিনি অসাধ্য সাধন করেছেন।
১৯৯৬ নাগাদ বিহার থেকে কালিম্পংয়ে গিয়েছিলেন হকির প্রশিক্ষক প্রেম সিং রানা। তিনি ভরতকে প্রস্তাব দেন বিহারে প্রশিক্ষণ নেওয়ার। এরপর পাহাড়ের মায়া কাটিয়ে সেখানে পাড়ি জমায় ছোট্ট ছেলেটি। পড়াশোনার পাশাপাশি হকির প্রশিক্ষণ চলে। ১৯৯৯-তে বিহার থেকে চলে যান বেঙ্গালুরুতে। ২০০০ সালে জুনিয়ার জাতীয় দলে সুযোগ পান। জুনিয়ার এশিয়া কাপ খেলতে গিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়। জুটেছিল সিলভার মেডেল। জয় এসেছিল ২০০১-এর জুনিয়ার ওয়ার্ল্ড কাপেও। এরপর সরাসরি জাতীয় দলে নাম লেখান। ২০১১-তে ভারতীয় হকি দলের অধিনায়কত্ব পান ভরত। তাঁর অধিনায়কত্বে ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকে খেলে ভারতীয় দল।
এরই মাঝে ২০১২ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ভারতীয় দলের প্রাক্তন অধিনায়ক। দেখাশোনা করে নয়, ভালোবেসেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন। ফোনে আলাপচারিতায় ভরত জানালেন, ২০০৩-এ চণ্ডীগড়ের বাসিন্দা হকি খেলোয়াড় গীতা ছেত্রীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল হায়দরাবাদে। প্রথম দেখায় বন্ধুত্ব হয়। ২০০৮ নাগাদ সেই সম্পর্ক প্রেমের পরিণতি লাভ করে। পরবর্তীতে বিয়ে সারেন। চণ্ডীগড়ে বিয়ে হলেও শিলিগুড়ি ও কালিম্পংয়ে জমকালো রিসেপশন হয়েছিল। ২০১৩-তে ভরত জাতীয় দল থেকে অবসর নেন। এরপর ২০১৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব পালন করেন। আর ২০১৮-তে পান মেজর ধ্যানচাঁদ অ্যাওয়ার্ড।
খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে গেলেও মাটির টান কি কারও পক্ষে ভোলা সম্ভব? উত্তর হল ‘না’। সেই টানেই ২০২২ সালে শিলিগুড়িতে ফেরেন হকি দলের প্রাক্তন অধিনায়ক। একটি ব্যাংকে সিনিয়ার ম্যানেজার পদে কাজ শুরু করেন। সেইসঙ্গে পাহাড়ের খুদে খেলোয়াড়দের জন্য অ্যাকাডেমি গড়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। অবশেষে ২০২৩ সালে বাড়ির অদূরে ভরত ছেত্রী হকি অ্যাকাডেমি গড়ে তোলেন তিনি। কারণ, আরও ভরত তুলে আনতে হবে তো পাহাড় থেকে। সেখানে বর্তমানে প্রায় ৫০ জন খুদে হকির প্রশিক্ষণ নিচ্ছে বিনামূল্যে। ভরত ও তাঁর স্ত্রী সেখানে অনুশীলন করান। তাঁদের তিন সন্তান। এর মধ্যে বছর ১১-র ছেলে বাবার মতোই হকিতে হাত পাকাতে শুরু করেছে।
হকির অ্যাস্ট্রোটার্ফে রাজত্ব করা ভরত রাজনীতির আঙিনায় ছাপ ফেলতে শুরু করেছেন। চলতি বছর বিধানসভা নির্বাচনে তাঁকে কালিম্পং আসনে প্রার্থী করে বিজেপি। ভোটে জিতে তিনি এখন বিধায়ক। দায়িত্বও অনেক। ফলে আগের মতো পরিবারকে সময় দিতে পারেন না। তবে বাবা হিসেবে সন্তানদের লালনপালনে কোনও খামতি রাখছেন না। পাশাপাশি, পাহাড়ের উন্নয়নের স্বপ্নে বুঁদ ভরত। তাঁর কথায়, ‘হকি টিম গেম, রাজনীতিও। হকিতে জাতীয় দলের ক্যাপ্টেন ছিলাম। এখন মানুষ আমাকে কালিম্পংয়ের ক্যাপ্টেন করেছেন। তাঁদের স্বপ্ন পূরণ সহ পাহাড়ের উন্নয়নই আমার লক্ষ্য।’

