প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান: মধ্যযুগে ‘ঢেঁড়া পিটিয়ে’ ঘোষণা করা হত রাজকীয় কোনও বার্তা। আর এখন বিজেপির তরফে ‘ঢেঁড়া’ পিটিয়ে ‘ফতোয়া’ জারি করে চাষিদের কয়েকশো বিঘা জমিতে বন্ধ করে দেওয়া হল চাষাবাদ! এমন ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁষছেন পূর্ব বর্ধমানের (Bardhaman) জামালপুরের (Jamalpur) জ্যোৎশ্রীরাম অঞ্চলের জ্যোৎচাঁদ ও পাইকপাড়া গ্রামের চাষিমহল। তাঁদের কথা অনুযায়ী, শুধু ঢেঁড়া পেটানোই নয়, চাষ বন্ধের ফতোয়ার কথা সাদা কাগজের উপর লিখে তা গ্রামের বিভিন্ন দেওয়ালে সাঁটিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই কাগজে বিজেপির স্থানীয় ৬ জন বুথ কমিটি সদস্যের নাম এবং মণ্ডল সভাপতির কথাও উল্লেখ ছিল। বিজেপি নেতাদের এমন কীর্তির কথা জানাজানি হতেই রাজনৈতিক মহলে শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
অভিযোগ, বিজেপির নাম করে লেখা ওই ’পোস্টারে’র মাধ্যমে জানানো হয়েছে, ২০২৬ সালের ৯ জুলাই থেকে জ্যোৎচাঁদ ও পাইকপাড়ার নদীর ধার থেকে ঝাপানতলা পর্যন্ত জমির চাষআবাদ বন্ধ থাকবে। এটা নাকি বিজেপির মণ্ডল সভাপতির নির্দেশ। কেউ পার্টির নির্দেশ অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এমন নির্দেশ সংক্রান্ত পোস্টারে এলাকার বুথ কমিটির সদস্য উত্তম কোলে, বাপি কোলে, স্বপন বেরা, গৌতম বেরা, মুরারী পোড়েল ও মেঘনাথ পোড়েলের নাম লেখা রয়েছে। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, পোস্টারে যে মণ্ডল সভাপতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর নাম অসীম শীল ওরফে সন্তু। তিনি জামালপুর বিধানসভার ৩ নম্বর মণ্ডলের বিজেপি সভাপতি।
এই বিষয়ে জোৎচাঁদ গ্রাম নিবাসী সুকুমার মান্না পুলিশকে তাঁর অভিযোগে জানিয়েছেন (জিডি নম্বর:৫৫৫), বিজেপির তরফে ঢেঁড়া পিটিয়ে চাষআবাদ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তারা জমিতে এখন ট্রাক্টরও নামতে দিচ্ছে না। জমিতে নামলে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে।
সুকুমারের দাবি, গত বৃহস্পতিবার তিনি জমিতে নেমেছিলেন। তা জানতে পেরেই উত্তম কোলে ও মুরারী পোড়েল কাটারি হাতে নিয়ে জমিতে চলে আসে। জমিতে নামার জন্য তারা তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দিতে থাকে। ভয়ে তিনি জমি ছেড়ে পালিয়ে যান।
একই এলাকার অপর চাষি নবকুমার মান্না বলেন, “চাষ বন্ধ করে দিয়ে বিজেপির লোকজন ‘তোলা’ চাইছে। এই সবকিছুই বিজেপির মণ্ডল সভাপতির ইন্ধনে হচ্ছে। ওরা ট্রাক্টরের চালকদেরও জমিতে নামতে নিষেধ করে দিচ্ছে। যাঁরা ‘তোলা’ দিতে পেরেছে তাঁরাই শুধু এখন চাষ করছে।” আর এক চাষি তোতন মান্না বলেন, “আমরা পরিবর্তন চেয়েছিলাম। কিন্তু এরকম পরিবর্তন আমরা চাইনি। চাষ বন্ধ করে দিয়ে এখন শুধু তোলাবাজি চলছে।”
চাষিদের আনা এইসব অভিযোগের বিষয়ে মণ্ডল সভাপতি অসীম শীল ওরফে সন্তুর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “উত্তম কোলে আমাদের দলের বুথ সভাপতি। ওই এলাকায় খাস জমি রয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ হয়েছে, সে সব না জেনে কোনও মন্তব্য করব না।” পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, ওই ’পোস্টার’ বিজেপির ছেলেরা লেখেনি। তৃণমূল চক্রান্ত করে এসব লিখেছে।
ঘটনা প্রসঙ্গে রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী দুধকুমার মণ্ডল জানান, “চাষিদের সাথে এমন আচরণ আমরা কখনোই মেনে নেব না। গোটা ঘটনার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হবে। কেউ অন্যায় ভাবে চাষিদের চাষ করা বন্ধ করে দিয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এলাকার চাষিদের সাথে হওয়া অন্যায় অত্যাচার নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন সিপিএমের কৃষক সংগঠন, সারা ভারত কৃষক সভার রাজ্য কমিটির সদস্য বিনোদ ঘোষ। তিনি বলেন,“তৃণমূল রাজত্বে কৃষকদের উপর অত্যাচার, অবিচার ও শোষন কম হয়নি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলে বাংলায় ক্ষমতায় আসা বিজেপির রাজত্বে কৃষকরা এখন আরও বেশী অন্যায়,অত্যাচার ও জুলুমবাজির শিকার হচ্ছেন। মকুল রায় একদা বলেছিলেন, বিজেপি মানেই তৃণমূল। তার বাস্তব প্রতিফলন এখন দেখতে পাচ্ছেন জামালপুরের চাষিরা।”

