প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান: তৃণমূলের ভরাডুবি ঘটিয়ে বাংলায় এখন সরকার গঠন করেছে বিজেপি। তবুও জমিতে চাষ করতে নামতে পারলেন না পূর্ব বর্ধমানের (Bardhaman) জামালপুরের রেসলাতপুর গ্রামের দরিদ্র চাষি উত্তম মাজি! তাঁর অভিযোগ, তৃণমূলের রাজত্বে তৃণমূলের লোকজন বলপ্রয়োগ করে তাঁকে জমিতে নামতে দেয়নি। সেই একই কায়দায় এখন বিজেপির নেতারা বলপ্রয়োগ করে তাঁকে জমিতে নামতে দিচ্ছে না বলে তিনি ধান চাষ করতে পারছেন না। এই বিষয়ে তিনি পুলিশ ও প্রশাসন থেকে শুরু করে এলাকার বিধায়ক, সবার দ্বারস্থ হয়েছেন। কিন্তু ন্যায় বিচার না মেলায় দরিদ্র চাষি উত্তম মাজি এখন চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন।
জামালপুর ব্লকের জ্যোৎশ্রীরাম পঞ্চায়েত এলাকার একটি প্রত্যন্ত রেসলাতপুর। স্ত্রী কবিতা ও মেয়ে পায়েলকে সঙ্গে নিয়ে এই গ্রামের একপ্রান্তে থাকা মাটির দেওয়ালের ঘরে উত্তম মাজি বসবাস করেন।পুলিশ এবং বিধায়ককে তিনি তাঁর অভিযোগে জানিয়েছেন, মুণ্ডেশ্বরী নদীর চরে থাকা কাশবন সাফ করে তিনি সেখানে চাষের উপযোগী জমি তৈরি করেন। ছয় বিঘার মতো সেই জমিতে প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি চাষাবাদ করে যাচ্ছিলেন।ওই জমি চাষ করে যেটুকু রোজগার হত তা দিয়েই তিনি তাঁর সংসার চালাতেন। হঠাৎ করে ২০২০ সালে তাঁর ওই জমির উপর তৃণমূলের লেকেদের নজর পড়ে। তারপর থেকে তিনি জমিহারা হন। তিনি এও দাবি করেছেন, তিনি নিজে বিজেপির একজন কর্মী। তৃণমূল আমলে যারা তাঁকে চাষ করতে দিচ্ছিল না, তারাই এখন বিজেপি হয়ে গিয়ে ফের তাঁর জমি কেড়ে নিয়েছে!
উত্তম মাজি জানিয়েছেন, ২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর বলপ্রয়োগ করে মণ্ডেশ্বরীর চরের জমিতে তাঁর চাষ করা বন্ধ করে দেয় তৃণমূল। জমি ফিরে পেতে তিনি তখন কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। চার বছর পরে হাইকোর্টের নির্দেশে তিনি ফের ওই জমিতে চাষ শুরু করেছিলেন। কিন্তু রাজ্যে পালাবদল ঘটিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি নেতাদেরও চোখ পড়ে তাঁর জমির উপর। গত ১ জুলাই তিনি জমিতে গেলে বিজেপির জামালপুর ৩ নম্বর মণ্ডল সভাপতি অসীম শীল ওরফে সন্তুর ইন্ধনে এলাকার বিজেপি নেতা সম্রাট মালিক ও অরিন্দম মালিকরা তাঁকে জমিতে নামতে বাধা দেয়। পরে তারা তাঁকে তাঁর ওই জমিতে নামাই বন্ধ করে দেয়। এমনকি তাঁকে প্রাননাশেরও হুমকি দেওয়া হয় বলে উত্তম মাজি পুলিকে জানিয়েছেন।
এদিকে আমন ধান চাষের মরশুমে জমিহারা হতে হওয়ায় মাথায় হাত পড়ে যায় উত্তম ও তাঁর স্ত্রী কবিতার। উত্তম মাজি সোমবার জানান, জমি ফিরে পেতে তিনি জামালপুর বিধানসভার বিজেপি বিধায়ক অরুণ হালদারের দ্বারস্থ হয়েছিলেন।কিন্তু ওনার কাছে গিয়েও তিনি ন্যায় বিচার পান না। উল্টে তাঁকে বিধায়কের দুর্ব্যবহার ও হুমকি হজম করেই বাড়ি ফিরতে হয়। এই প্রসঙ্গে উত্তম বলেন, “এরপর থেকে আমার উপর এমন মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে যে, পরিবার নিয়ে আত্মহত্যা করা ছাড়া আমার আর কোনও উপায় নেই।”
যদিও এই বিষয়ে বিধায়ক অরুণ হালদার বলেন, ‘উত্তম মাজির অভিযোগ সত্য নয়। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি ওই এলাকার যাঁদের জমি একদা নদীগর্ভে তলিয়ে গিয়েছিল, সেই জমিতে উত্তম মাজি এতদিন চাষ করে খেয়েছে।”
বিজেপির কাটোয়া সাংগঠনিক জেলা সভাপতি স্মৃতিকণা বসু বলেন, ‘প্রকৃত ঘটনা কী তা না জেনে আমি কোনও মন্তব্য করবো না।” তবে এই বিষয়ে রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী দুধ কুমার মন্ডল সাফ জানিয়ে দিয়েছেন,“জমি সংক্রান্ত ‘ডিসপুট’ থাকলে তার নিস্পত্তি প্রশাসন ও ভূমি দফতরের আধিকারিকরা করবেন। অন্য কেউ কোনও চাষির চাষ বন্ধ করে দিতে পারে না।”
গোটা এই ঘটনা নিয়ে সিপিএমের কৃষক সংগঠন সারা ভারত কৃষক সভার রাজ্য কমিটির সদস্য বিনোদ ঘোষ বলেন,‘শুধু উত্তম মাজির জমিই নয়। ঢ্যাড়া পিটিয়ে ফতোয়া জারি করে বিজেপির লেকজন জ্যোৎশ্রীরাম অঞ্চলের জ্যোতচাঁদ এবং পাকইপাড়ার বহু চাষির জমিতে থাবা বসিয়েছে। ওইসব চাষিদের এখন তাঁদের জমিতে নামতেও দেওয়া হচ্ছে না। রাজ্যে ‘গুণ্ডা দমন’ আইন লাগু করা হলেও, বিজেপি করা ওখানকার লোকজন এখন বিজেপি দ্বারাই নির্যাতিত হয়ে চলেছেন।এটাই সবথেকে বড় আশ্চর্য্যের।” এই বিষয়ে তৃণমূল নেতা দেবু টুডু বলেন,“সবে তো শুরু। আগামী দিন বিজেপির আরও অনেক মহিমা দেখতে পাবেন রাজ্যবাসী।”

