উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: দুর্গাপুজোর (Durga Puja) আনন্দ মানেই বাঙালির হেঁশেলে ইলিশের (Bangladesh Hilsa) সুবাস। কিন্তু আসন্ন শারদোৎসবের ঠিক প্রাক্কালে দুই বাংলার মৎস্য বাণিজ্যে নেমে এসেছে এক বড় ধাক্কা। কোনো পূর্বভাস ছাড়াই ভারত ও মায়ানমার থেকে সমস্ত ধরনের ইলিশ আমদানি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এ দেশের ১০৩ জন মাছ আমদানিকারকের নামে ইস্যু করা সমস্ত নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট বা ছাড়পত্র বাতিল করায় ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। ঢাকা শেষ পর্যন্ত এপার বাংলায় ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেবে কি না, তা নিয়ে এখন তীব্র দোলাচল তৈরি হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সচিব এস এ মকসুদ জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য দপ্তরের পক্ষ থেকে হঠাৎই এই কড়া নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। ঠিক কী কারণে এই অনুমতি হঠাৎ প্রত্যাহার করা হলো, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই কারও। তবে বিগত দুই মাসে ভারত থেকে প্রায় ৫৮০ মেট্রিক টন ইলিশ ওপারে পাঠানো হয়েছিল। পাশাপাশি, প্রথমবার ভারতের গুজরাট উপকূল থেকে ডিমভর্তি ইলিশও বাংলাদেশে রপ্তানি করার এক নতুন বাণিজ্য পথ খুলেছিল। অন্যদিকে, চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১,২০০ মেট্রিক টন ইলিশ পাঠানোর কথা প্রাথমিকভাব অনুমোদিত হলেও তা নিয়ে এখন ঘোর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার ভারতে ইলিশ রপ্তানির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। তবে দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৯ সাল থেকে প্রতি বছর দুর্গাপুজোর আগে নির্দিষ্ট কোটায় কিছু হাজার টন ইলিশ ভারতে পাঠানোর অনুমতি দিয়ে আসছে ঢাকা। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন নীতিগত সিদ্ধান্তের ফলে সেই বাণিজ্যে বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটেছে। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মার ইলিশের অতুলনীয় স্বাদের কারণে এপার বাংলার মানুষের কাছে এর কদর সবসময়ই সবচেয়ে বেশি। তবে ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, গুজরাটে স্থানীয় পর্যায়ে মাছের চাহিদা অত্যন্ত কম থাকায় সেখানকার অতিরিক্ত জোগান মূলত পশ্চিমবঙ্গেই পাঠানো হচ্ছিল।
মকসুদ আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, গুজরাট (Gujarat) থেকে মূলত ডিমভর্তি মাছই বাংলাদেশে পাঠানো হতো। সেখানকার ব্যবসায়ীরা মাছের ডিম আলাদা করে প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করতেন এবং বাকি অংশ কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো অঞ্চলে শুঁটকি হিসেবে সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের এই হঠাৎ আদেশের ফলে সমস্ত সমীকরণ পাল্টে গেছে। ভারত ও মায়ানমার মিলিয়ে প্রায় ১,৭৩৯ মেট্রিক টন ইলিশ আমদানির যে দরজা খোলা হয়েছিল, তা এখন পুরোপুরি বন্ধ।
এদিকে দুর্গাপুজো শুরু হতে হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি দিন বাকি। প্রতি বছর পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে পদ্মার ইলিশের ট্রাকে ট্রাকে কনভয় আসার অপেক্ষায় থাকে কলকাতার বাজার। কিন্তু চলতি বছর ব্যবসায়ীরা বারবার আবেদন নিবেদন করলেও এখন পর্যন্ত ওপার বাংলা থেকে কোনো ইতিবাচক সবুজ সঙ্কেত মেলেনি। বিগত বছরগুলোর পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ১,২০০ মেট্রিক টন রপ্তানির অনুমতি মিললেও সময়ের অভাবে মাত্র ১৫০ মেট্রিক টন মাছ এপারে আনা সম্ভব হয়েছিল। একইভাবে ২০২৪ ও ২০২৩ সালে যথাক্রমে ২,৪২০ এবং ৩,৯৫৬ টন অনুমোদিত হলেও মাত্র ৫৭৭ ও ৫৮৭ টন মাছ হাতে পেয়েছিল ভারত। এমতাবস্থায় অক্টোবর মাসের শুরুতেই বাংলাদেশের নদীতে মাছ ধরার দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়ে যাওয়ায়, আর সামান্য যেটুকু সময় হাতে রয়েছে তাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ইলিশ আমদানি করা একপ্রকার অসম্ভব বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।

