বিধানসভা ভোটের আগে বালুরঘাটের অলিগলি, গ্রাম থেকে শহরের দেওয়াল সবই এখন রঙে, ছড়ায় আর রাজনৈতিক বার্তায় ঢেকে যাচ্ছে। তৃণমূল, বিজেপি, কংগ্রেস কিংবা বাম কেউই পিছিয়ে নেই এই দেওয়াল দখলের লড়াইয়ে। কিন্তু এই রঙিন প্রচারের আড়ালেই ধরা পড়ছে এক ফিকে বাস্তবের চেহারাও। যেখানে ফুটে উঠছে দেওয়াল লিখনের শিল্পীদের অনিশ্চিত উপার্জন আর আক্ষেপের গল্প। খোঁজ নিলেন পঙ্কজ মহন্ত।
বালুরঘাট: ভোট এলেই তাঁদের কদর বাড়ে। রাজনৈতিক দলগুলির ডাক আসে একের পর এক। তার পরেই তাঁদের নিপুণ হাতের জাদুতে দেওয়ালজুড়ে কোথাও ফুটে ওঠে ঘাসফুল, কোথাও পদ্ম, কোথাও হাত, কোথাও কাস্তে-হাতুড়ি-তারা কিংবা কোদাল-বেলচা। কিন্তু কাজের পরিমাণ বাড়লেও, বাড়ে না পারিশ্রমিক। বালুরঘাটের (Balurghat) একাধিক অঙ্কনশিল্পীর কথায়, রং, চুন, তুলি সবকিছুর দাম বাড়লেও, তাঁদের মজুরি আটকে রয়েছে সেই পুরোনো অঙ্কেই। এখনও দেওয়ালপিছু ১০০ থেকে ১৫০ টাকাতেই সীমাবদ্ধ পারিশ্রমিক। দিনের শেষে যা তাঁদের পরিশ্রমের তুলনায় প্রায় নগণ্য।
ভোটের ময়দানে বালুরঘাটে দেওয়াল লিখন এখন কেবল আর নিছক প্রচারের মাধ্যম নয়। এ যেন রাজনৈতিক দলের শক্তি প্রদর্শনের অন্যতম হাতিয়ারও। ছড়া, কার্টুন, কটাক্ষ- সব মিলিয়ে এক আলাদা ভাষা তৈরি করছে এই দেওয়ালগুলো। আর সেই ভাষার নির্মাতাশিল্পীদের প্রাপ্য স্বীকৃতি বা ন্যায্য পারিশ্রমিক দুটোই থেকে যাচ্ছে অধরাই। বালুরঘাটের অঙ্কনশিল্পী বিশ্বজিৎ সোম জানালেন, প্রার্থী ঘোষণার আগেই প্রায় সব দলের কাছ থেকেই কাজের ডাক পেয়েছেন তিনি। ‘দিনে আট থেকে দশটা দেওয়াল করছি। ভোটের আগে ২৫০ থেকে ৩০০টা দেওয়াল শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে’, বললেন তিনি। তিনি জানান, শুধু লেখা নয়, অনেক সময় ছড়া বা কার্টুন আঁকার আলাদা চাহিদাও থাকে। কিন্তু সেই বাড়তি শ্রমের আলাদা কোনও মূল্য নেই। ‘যে পরিমাণ পরিশ্রম করছি, সেই অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাচ্ছি না। তবুও বহু বছরের অভ্যাস, আর দলের অনুরোধে না করতে পারিনি’, আক্ষেপ ঝরে পড়ে তাঁর গলায়।
কার্যত একই কথা শোনা যায় শিল্পী মন্মথ মহন্তের গলাতেও। কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে তিনি একাধিক দলের হয়ে দেওয়াল লিখনের কাজ করছেন। তাঁর কথায়, ‘শহর থেকে গ্রাম সারাদিন ছুটে বেড়াতে হচ্ছে। অনেকসময় পরিচিতদের অনুরোধ ফেলতে পারি না। রংতুলির দাম বাড়ছে, কিন্তু আমাদের পারিশ্রমিক সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে। বরং নিজের পকেট থেকেই অনেক সময় খরচ পড়ে যায়।’ শিল্পী সুবিমল সরকারের কথায় উঠে এল আরও এক কঠিন বাস্তব। ‘দুজনে মিলে কাজ করছি। ভোটের আগে প্রায় ২৫০টা দেওয়াল লিখতে হবে। কিন্তু যে খরচ হচ্ছে, সেটা আদৌ উঠবে কি না বুঝতে পারছি না’, বললেন তিনি। দিনের বেলায় নিজের রোজগারের অন্য কাজ সামলে, রাত বাড়তেই শুরু হয় দেওয়াল লিখনের পালা। ‘রাতেই বেশি কাজ করতে হয়। তখন রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকে’, যোগ করেন তিনি।
কাজের গুরুত্ব থাকলেও, কোনও দলই এখনও পারিশ্রমিক বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই ‘পরিচিতি’ বা ‘দলের অনুরোধ’-এর উপর নির্ভর করেই কাজ করতে হচ্ছে। ভোটের আগে দেওয়ালগুলো রঙিন হয়ে উঠছে, নতুন বার্তায় ঢেকে যাচ্ছে পুরনো লেখা। ভোট মিটলেই সেই রং ফিকে হবে, বদলে যাবে দেওয়ালের ভাষা। কিন্তু শিল্পীদের জীবনের চিত্রটা থেকে যায় প্রায় অপরিবর্তিতই। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, যাঁদের হাত ধরে রাজনীতির বার্তা পৌঁছায় মানুষের দরজায় দরজায়, তাঁদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের দায়িত্ব কি কোনও রাজনৈতিক দলের নয়? নাকি ভোটের রং মুছে গেলে, তাঁদের কথাও মিলিয়ে যায় দেওয়ালের পুরোনো রঙের মতোই?
