সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, আটলান্টা: ফুটবল বিধাতার এ এক অদ্ভুত চিত্রনাট্য! দীর্ঘ ২২ বছরের আন্তর্জাতিক কেরিয়ার, ছয়টা বিশ্বকাপ, দুশোর বেশি ম্যাচ এবং ৫০টিরও বেশি দেশের বিরুদ্ধে মাঠে নামার পরও, লিওনেল মেসি আজ পর্যন্ত কখনও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলেননি। ৩৯ বছরের গোধূলিবেলায় এসে তাঁকে লড়তে হবে ২৩ বছরের এক তরুণের বিরুদ্ধে, যাঁর জন্মই যেন হয়েছে ফুটবলের রাজদণ্ড ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য—জুডে বেলিংহাম (Argentina vs England)।
আটলান্টার এই সেমিফাইনাল তাই শুধুই দুই প্রজন্মের নয়, ফুটবলের দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দর্শনেরও লড়াই। একদিকে মেসির সেই মায়াবী ফুটবল। যিনি ম্যাচের প্রথম দশ মিনিট স্রেফ হেঁটে হেঁটে প্রতিপক্ষের রক্ষণের নকশাটা মাথায় এঁকে নেন। তাঁর খেলা মানেই নিখুঁত জ্যামিতিক পাস আর চোখের পলকে হিসেব বদলে দেওয়া ফিনিশ। অন্যদিকে রয়েছেন বেলিংহাম, যাঁর খেলা যেন একটা উদ্দাম ঝড়ের মতো। মাঠে বুক চিতিয়ে ১২ কিলোমিটার দৌড়ানো, নীচে নেমে ট্যাকল করা, আবার পরমুহূর্তেই ৬০ গজ স্প্রিন্ট টেনে হেডে গোল করা- এই তরুণের স্পর্ধাই এখন ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় বাজি।
এই দুই তারকার লড়াইটা আবার গোল্ডেন বুটেরও। আটটি গোল করে মেসি যেখানে কিলিয়ান এমবাপের সঙ্গে শীর্ষস্থানে, সেখানে নরওয়ের বিরুদ্ধে খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তোলা জুডে দাঁড়িয়ে আছেন ছয়টি গোল নিয়ে। তবে বিপক্ষ শিবিরে সর্বকালের অন্যতম সেরার উপস্থিতি নিয়ে বেলিংহামের গলায় সমীহ থাকলেও, ভয়ের লেশমাত্র নেই। ইংল্যান্ডের এই নতুন তারকার সোজা কথা, ‘ছোটবেলায় মেসিকে দেখে মনে হত উনি বুঝি বাস্তবের কেউ নন। ওঁর সঙ্গে এক মাঠে খেলাটা সত্যিই সম্মানের। কিন্তু আমাদের দল এখন আর বিপক্ষের নাম দেখে ভয় পায় না। সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে তা নিয়ে আমাদের থোড়াই কেয়ার, আমরা এখানে বিশ্বকাপ জিততে এসেছি।’
মেসিকে নিয়ে রীতিমতো সতর্ক ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুচেলও। জার্মান কোচের মতে, ‘লিওকে একজন ফুটবলার দিয়ে মার্ক করে আটকানো যায় না, ওটা একটা ভুল ধারণা। আপনি একজনকে পাহারায় রাখলে ও ঠিক তাকে টেনে এমন জায়গায় নিয়ে যাবে, যেখানে আপনার পুরো রক্ষণটাই ভেঙে পড়বে।’ তাই ডেকলান রাইস আর কোবি মাইনোকে দিয়ে মাঝমাঠে একটা নিশ্ছিদ্র দেওয়াল তোলার অঙ্ক কষছেন তিনি।
মাঠের ভেতরের এই সমীকরণের পাশাপাশি কৌশলগত দিক থেকেও ম্যাচটা দারুণ আকর্ষক হতে চলেছে। সেমিফাইনাল মানেই সাধারণত খোলসে ঢুকে থাকা রক্ষণাত্মক ফুটবলের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিন্তু আটলান্টা স্টেডিয়ামের পরিসংখ্যান বলছে একেবারে অন্য কথা। খাতায়-কলমে দুই দলের আক্রমণভাগ যতই বিধ্বংসী হোক না কেন, শেষ চারের টিকিট পাওয়ার রাস্তাটা কিন্তু নিশ্ছিদ্র রক্ষণ দিয়ে তৈরি হয়নি। পাঁচটা করে ম্যাচ খেলে দুই দলই ছয়টি করে গোল হজম করেছে এবং টুর্নামেন্টে মাত্র একটি করে ক্লিনশিট রয়েছে তাদের। পরিসংখ্যান বলছে, শেষ চারের দলগুলির মধ্যে ইংল্যান্ডের রক্ষণই প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে বেশি ফাঁকা জায়গা ছেড়ে দিয়েছে। পিছিয়ে নেই আর্জেন্টিনাও। বক্সের ভেতর বিপজ্জনক শট আটকানোর ক্ষেত্রে এবারের সেমিফাইনালিস্টদের মধ্যে তাঁরাই সবচেয়ে পেছনে। তেকাঠির নীচে এমিলিয়ানো মার্টিনেজের দুর্দান্ত সেভগুলি না থাকলে মেসিদের হয়তো এতদূর আসাই হত না।
তাই ট্যাকটিকাল লড়াইটা মূলত হবে মাঝমাঠে, যেখানে লিওনেল স্কালোনির নিজস্ব একটা জ্যামিতিক ছক আছে। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্ডেজ আর রডরিগো ডি পলকে নিয়ে মাঝমাঠে একটা জমাট ব্লক তৈরি করেন স্কালোনি। এতে প্রতিপক্ষ বাধ্য হয় মাঠের দুই প্রান্ত বা উইং ব্যবহার করতে। আর ঠিক এখানেই লুকিয়ে আছে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। উইংয়ে লোক কম থাকায় দ্রুত প্রান্ত বদলে আক্রমণ শানালে ফুলব্যাকরা প্রায়ই একা পড়ে যান।
স্কালোনির এই দুর্বলতাকেই নিজের প্রধান হাতিয়ার করতে চাইছেন টুচেল। তাঁর স্ট্র্যাটেজি হল, বুকায়ো সাকা আর অ্যান্থনি গর্ডনকে দুই প্রান্ত বরাবর খেলিয়ে আর্জেন্টিনার ডিফেন্সকে চওড়া করে দেওয়া। এতে বেলিংহাম আর হ্যারি কেন বক্সে হানা দেওয়ার জন্য অনেকটা খোলা জায়গা পেয়ে যাবেন। টুচেল নিজের পরিকল্পনার কথা গোপনও করছেন না। তিনি স্পষ্টই বলেছেন, এনজো আর ম্যাক অ্যালিস্টারকে মাঝমাঠে খেলতে দিলে বিপদ, তাই মাঠের পুরো চওড়া অংশটা ব্যবহার করে দ্রুত আক্রমণে উঠতে হবে। পাশাপাশি, টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি বল ইন্টারসেপ্ট করা ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর আগ্রাসনকে কেন কীভাবে তাঁর বুদ্ধি দিয়ে ভোঁতা করেন, আর মাঝমাঠে রডরিগোর সঙ্গে রাইসের বল দখলের টক্করটা কে জেতেন- তার ওপর সেমিফাইনালের ফল অনেকটাই নির্ভর করবে।
কৌশল আর মাঠের এই বুদ্ধির লড়াইয়ের সঙ্গে আবার জড়িয়ে আছে এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক রেষারেষিও। এই দুই দলের বৈরিতার শিকড় এমনিতে অনেক গভীরে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে ওয়েম্বলির কোয়ার্টার ফাইনালে জয়ের পর ইংল্যান্ডের তৎকালীন কোচ আলফ রামসে আর্জেন্টাইনদের ‘জন্তু’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন। তারপর থেকে এই দুই দেশের ম্যাচ মানেই বারুদে ঠাসা এক উত্তেজনা। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে দিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মেরে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড দেখা এবং টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার সেই রুদ্ধশ্বাস জয় আজও ইংরেজদের কাছে এক দগদগে ক্ষত। ঠিক চার বছর পর, ২০০২ বিশ্বকাপে সেই বেকহ্যামের গোলেই অবশ্য মধুর প্রতিশোধ নিয়েছিল ইংল্যান্ড।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আটলান্টার এই ম্যাচ তাই শুধু একটা সেমিফাইনাল নয়, এ হল দুটো ভিন্ন ফুটবলীয় পরিচয়ের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা যেখানে চাইছে নিজেদের ফুটবল-আধিপত্য বজায় রাখতে, সেখানে গত ৬০ বছর ধরে বড় ট্রফি না জেতা ইংল্যান্ড মরিয়া হয়ে আছে নিজেদের ব্যর্থতার তকমা মুছে ফেলতে।

