দামিনী সাহা, আলিপুরদুয়ার: আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালের (Alipurduar Hospital) চিকিৎসক নন, হাসপাতালের কোনও প্রশাসনিক পদেও নেই। তবু জেলা হাসপাতালে কোন বিভাগে কখন কী হচ্ছে, কোন চিকিৎসক কখন ডিউটি দিচ্ছেন, কোথায় কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তার খবর নাকি আগেই পৌঁছে যাচ্ছে ডাঃ মাধব হালদারের কাছে। অভিযোগ, শুধু খবর রাখাই নয়, হাসপাতালের বিভিন্ন অফিসে অনুমতি ছাড়াই ঢুকে নথিপত্র দেখা থেকে শুরু করে চিকিৎসকদের ডিউটি রোস্টার নিয়ে নজরদারি, রোগীর চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি দেখার চেষ্টা করছেন তিনি। এমনকি নিজের প্যাথলজি ল্যাব থেকে পরীক্ষা করানোর জন্য চিকিৎসকদের উপর চাপ তৈরিও করছেন। তাঁর হস্তক্ষেপে আপত্তি জানালে বদলি করিয়ে দেওয়ার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ হাসপাতালেরই একাংশের।
ডাঃ হালদার অবশ্য জেলা হাসপাতালের কাছে একেবারেই অপরিচিত নন। ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি এই হাসপাতালের চেস্ট স্পেশালিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরে ফালাকাটা সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালেও (Falakata Tremendous Speciality Hospital) কাজ করেছেন। বর্তমানে সরকারি চাকরি ছেড়ে আলিপুরদুয়ার শহরের বক্সা ফিডার রোডে একটি প্যাথলজি ল্যাব চালানোর পাশাপাশি বিজেপির জেলা কমিটির সদস্য এবং এগজিকিউটিভ মেম্বার হিসেবে যুক্ত রয়েছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিজেপি (BJP) ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জেলা হাসপাতালের উপর তাঁর দাপট বেড়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অফিস বা বিভাগে ঢুকে কাগজপত্র দেখতে চাইছেন তিনি। হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ খবরও তাঁর কাছে নিয়মিত পৌঁছায় বলে দাবি কয়েকজন চিকিৎসাকর্মীর। এমনকি চিকিৎসকদের কে কখন, কতক্ষণ ডিউটি করবেন, সেই রোস্টার তৈরির ক্ষেত্রেও তাঁর ইন্ধন বা নজরদারি রয়েছে বলে অভিযোগ।
এর সঙ্গে আরও গুরুতর অভিযোগ, চিকিৎসকদের উপর চাপ সৃষ্টি করে তাঁর নিজের ল্যাব থেকেই বিভিন্ন পরীক্ষা করানোর চেষ্টা। হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী পরোক্ষভাবে তাঁকে মদত দেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের আশঙ্কায় প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাইছেন না অনেকেই।
এক চিকিৎসাকর্মীর কথায়, ‘হাসপাতালের কোথায় কী হচ্ছে, অনেক সময় বাইরে থেকেও তার খবর চলে আসে। বিষয়টি নিয়ে অনেকের মধ্যেই অস্বস্তি রয়েছে।’ এক চিকিৎসক বলেন, ‘কোনও বিষয়ে আপত্তি জানালে পরে বদলি বা অন্য কোনও প্রশাসনিক সমস্যায় পড়তে হতে পারে, এই আশঙ্কাতেই অনেকে চুপ থাকছেন।’
ডাঃ হালদার রোগীর চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি নিয়েও ঘঁাটাঘঁাটি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যক্তিগত তথ্য রোগীর গোপনীয়তার আওতায় পড়ে। রোগীর অনুমতি বা আইনগত প্রয়োজন ছাড়া তৃতীয় পক্ষের হাতে এই ধরনের তথ্য তুলে দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে রাজনৈতিক পরিচয় বা হাসপাতালের প্রাক্তন চিকিৎসক হওয়ার সুবাদে কোনও ব্যক্তি প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া নিজের ইচ্ছেমতো রোগীর চিকিৎসা-নথি দেখতে পারেন কি না, তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।
অভিযোগের মুখে নিজের অবস্থান অবশ্য স্পষ্ট করেছেন ডাঃ মাধব হালদার। তাঁর দাবি, আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতাল অব্যবস্থার জলজ্যান্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসকদের নির্দিষ্ট সময়ে হাসপাতালে না আসা, ছুটির আবেদন না জানিয়েই অনুপস্থিত থাকা সহ একাধিক অভিযোগ তুলেছেন তিনি। তাঁর সাফ বক্তব্য, ‘হাসপাতালের অব্যবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা যদি মাতব্বরি হয়, তাহলে একশো বার সেই মাতব্বরি করব। আগে যেভাবে দালালচক্র সক্রিয় ছিল, এখন অনেকেই তা করতে পারছেন না। তাই আমাকে নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। জনপ্রতিনিধির সঙ্গে যাচ্ছি। আমি নিজেও যেহেতু চিকিৎসক, সেক্ষেত্রে আমার এতটুকু করার অধিকার আছে।’
কিন্তু এখানেই উঠছে পালটা প্রশ্ন। হাসপাতালের অনিয়ম নজরে আনা এক বিষয়, আর প্রশাসনিক অনুমতি ছাড়া রোগীর ব্যক্তিগত চিকিৎসা-নথি দেখা, চিকিৎসকদের ডিউটি ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার কিংবা নির্দিষ্ট বেসরকারি ল্যাবে পরীক্ষা করানোর জন্য চাপ তৈরি করার অভিযোগ সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। যদিও ডাঃ হালদার এই অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন তবুও নজরদারির নামে এই সীমারেখা আদৌ মানা হচ্ছে কি না, সেটিই খতিয়ে দেখার বিষয়।
জেলা হাসপাতালের সুপার পরিতোষ মণ্ডল বলেন, ‘এই সংক্রান্ত কোনও লিখিত অভিযোগ এখনও পাইনি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’ বিধায়ক পরিতোষ দাসও জানান, অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

