Alipurduar | পদ্মবনেই ঘাসফুলের নজর! মাদারিহাটে বিজেপি ভোটব্যাঙ্ক দখলে উন্নয়নের ‘উলটপুরাণ’ তৃণমূলের

Alipurduar | পদ্মবনেই ঘাসফুলের নজর! মাদারিহাটে বিজেপি ভোটব্যাঙ্ক দখলে উন্নয়নের ‘উলটপুরাণ’ তৃণমূলের

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, বীরপাড়া: ২ কোটি ৬৭ লক্ষ ৯৯ হাজার ১২১ টাকায় তৈরি পেভার্স ব্লক বিছানো রাস্তাটার পাশে আড্ডা দিচ্ছিলেন মহিলারা। এলাকার তৃণমূল কর্মী রতন রায়কে দেখে আড্ডা থেকে বৃদ্ধা জয়মতি রায় বলে উঠলেন, ‘মূল রাস্তাটা হল। শাখা রাস্তাটা তো হল না।’ রতন অবশ্য বললেন, ‘ওটাও করার চেষ্টা করছি।’

আলিপুরদুয়ারের (Alipurduar) মাদারিহাটের (Madarihat) রাঙ্গালিবাজনা গ্রাম পঞ্চায়েতের দেবেন্দ্রপুর এলাকাটি অবশ্য বহু বছর ধরে বিজেপির ঘাঁটি। ২০১৩ সাল থেকে পঞ্চায়েত ভোটে ওই মহল্লায় টানা জিতে আসছেন পদ্ম প্রার্থীরা। এলাকা থেকে নির্বাচিত বিজেপির পঞ্চায়েত সদস্যা তনুশ্রী রায়ই এখন রাঙ্গালিবাজনা গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান। পেভার্স ব্লকের রাস্তাটির বেশিরভাগ অংশ তনুশ্রীর এলাকায় পড়ে।

দলের পঞ্চায়েত সদস্যদের নির্বাচনি এলাকা তৃণমূল সরকার উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে বলে রাজ্যের আনাচে-কানাচে অভিযোগ করে থাকে বিজেপি। মাদারিহাট বিধানসভা কেন্দ্রে গত ৫ বছরের ছবিটা অবশ্য বিপরীত। কট্টর তৃণমূলিদের এলাকায় বরং রাস্তাঘাট, পানীয় জলের ভয়ংকর সমস্যা। তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন, এমন বাসিন্দারা রাগে-ক্ষোভে বেফাঁস মন্তব্য করে ফেলেন কখনো-কখনো।

তৃণমূল (TMC) নেতারা প্রতিবাদ করেন না। সাফাইও দেন না। তবে খেয়াল করলে বোঝা যায়, নীরবে তাঁদের নজর থাকে বিজেপির পঞ্চায়েত সদস্যদের এলাকায়। সেখানকার উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেয় প্রশাসন। ২০২৪ সালের উপনির্বাচনে তৃণমূল মাদারিহাট বিধানসভা কেন্দ্র দখল করার পর ওই পথে যেন আরও বেশি জোর দিয়েছে রাজ্য সরকার, এমনকি তৃণমূল পরিচালিত গ্রাম পঞ্চায়েতগুলি।

এমন উলটপুরাণ কেন? তৃণমূল নেতারা নাকি বুঝেছেন, ২০২৪ সালের উপনির্বাচনে প্রথমবার মাদারিহাট দখলে বিজেপি সমর্থক ভোটারদের অবদান রয়েছে। তাই বিজেপি প্রভাবিত এলাকার উন্নয়নে একইসঙ্গে প্রতিদান এবং ভবিষ্যতে আবার ভোট পাওয়ার রাস্তা খোলা রাখছে ঘাসফুিল নেতৃত্ব।

মাদারিহাট ডুয়ার্সের চা বলয়ের মধ্যে পড়ে। বামফ্রন্টের আরএসপি’র হাতছাড়া হওয়ার পর ২০১৬ এবং ২০২১ সালে পরপর দু’বার বিধায়ক হন বিজেপির মনোজ টিগ্গা। ২০১৯ সালে আলিপুরদুয়ার লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপির জন বারলাকে ঢেলে ভোট দিয়েছিলেন মাদারিহাটের বাসিন্দারা। ভোটে জিতে বান্দাপানি গ্রাম পঞ্চায়েতের এলাকা দত্তক নিয়েছিলেন জন। কিন্তু বান্দাপানির উন্নয়নে জনের অবদান শূন্য।

বরং জন দত্তক নিলেও বান্দাপানির উন্নয়নে ঝাঁপিয়ে পড়ে তৃণমূল পরিচালিত গ্রাম পঞ্চায়েত, মাদারিহাট-বীরপাড়া পঞ্চায়েত সমিতি এবং জলপাইগুড়ি জেলা পরিষদ। পানীয় জলের সমস্যা মেটাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ডিমডিমা চা বাগান থেকে নাংডালা, জয়বীরপাড়া, ঢেকলাপাড়া হয়ে বান্দাপানি পর্যন্ত রাস্তাটি কয়েক কোটি টাকায় পাকা করা হয়। নদীভাঙন রোধে কয়েকটি এলাকায় ছোট ছোট পাড়বাঁধ তৈরি হয়।

এই কর্মযজ্ঞের পাশাপাশি তৃণমূলের নাগাড়ে প্রচার চলে, উন্নয়নে মনোজ এবং জন কিছুই করেননি। ২০২৪ সালের উপনির্বাচনে এই জোড়া কৌশলের ফল মেলে হাতে হাতে। মাদারিহাট কেন্দ্রে বুথের সংখ্যা ২২৩টি। তার মধ্যে এলাকার ২৪টি চা বাগানেই ১০০টি বুথ আছে। তার ৮০টিতে এগিয়ে ছিলেন তৃণমূল প্রার্থী জয়প্রকাশের। এতে আরও উৎসাহ বাড়ে ঘাসফুল শিবিরের।

পরিণামে বান্দাপানি গ্রাম পঞ্চায়েতের বিরোধী দলনেতা টেম্পু ওরাওঁয়ের মহল্লা থেকে বাগানের দক্ষিণদিকের অংশটি যোগ করেছে পেভার্স ব্লকের রাস্তা। বাগানের দক্ষিণ প্রান্তে তৈরি হয়েছে ঝাঁ চকচকে ক্রেশ। তৃণমূলের স্থানীয় নেতারা সাধারণ চা শ্রমিকদের মধ্যে প্রচার করেন, ‘দেখলি, কেমন রাস্তা বানিয়ে দিলাম।’

২০২৪ সালের ৯ নভেম্বর ভগতপাড়ায় গিয়ে বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গেই বৈঠক করেন রাজ্যের খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী জ্যোৎস্না মান্ডি। সেখানে বিজেপির ভোটার বেশি। এলাকার রাস্তাটি পাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন মন্ত্রী। তৃণমূলের তৎকালীন ফালাকাটা ব্লক সভাপতি সুভাষচন্দ্র রায় বলেছিলেন, ‘রাস্তা পাকা করে দিতে না পারলে জীবনে আর আপনাদের কাছে ভোট চাইতে আসব না।’

এলাকার কট্টর বিজেপি সমর্থকরাও ভেবেছিলেন, উপনির্বাচনে দলের প্রার্থী জিতলেও তো মমতাই মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন। বরং তৃণমূল বলছে যখন, তখন বিধানসভা নির্বাচনের আগে দেড় বছর সময় দেওয়া যাক। দেখি, ওরা কী করে! উপনির্বাচনে ওই এলাকায় ভালো ভোট পেয়েছিলেন তৃণমূলের জয়প্রকাশ। বাজিমাত হওয়ার পর ওই টোটকাকেই মাদারিহাটের বিভিন্ন এলাকায় ব্যবহার করছে শাসকদল।

জয়প্রকাশ জিতেছিলেন ২৮১৬৮ ভোটে। সংখ্যাটা কম নয়, মানছে বিজেপি। তবে তৃণমূল বিলক্ষণ জানে, উপনির্বাচনের মতো শুধু আশ্বাসে আর চিঁড়ে নাও ভিজতে পারে। তাই হাতে হাতে কাজ দেখিয়ে বিজেপি অধ্যুষিত এলাকায় ভোট চাওয়ার ‘রাস্তা’ বানাচ্ছে তৃণমূল। দলদলি ডাইভারশন লাগোয়া মহল্লাটিতে কাঁচা রাস্তায় এখন কংক্রিট ঢালাই চলছে জোরকদমে।

উত্তর রাঙ্গালিবাজনায় চারটি পার্টের পঞ্চায়েত সদস্যই বিজেপির। অথচ ওই এলাকায় একাধিক রাস্তা তৈরি হয়েছে। তৃণমূলের নীচুতলার কর্মীরাই বলছেন, চোখে আঙুল দিয়ে কাজ দেখিয়ে দিতে না পারলে দ্বিতীয়বার একই কৌশল কাজ করবে না। রেষারেষি সরিয়ে আপাতত তাই পদ্মবনেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ঘাসফুল।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *