Alipurduar | কালজানির দুই পারে নিভৃতে পদ্ম চাষ সংঘের

Alipurduar | কালজানির দুই পারে নিভৃতে পদ্ম চাষ সংঘের

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


প্রতিটি বিধানসভা এলাকা একেকটি জীবন্ত জনপদ। তার নিজস্ব রসায়ন আছে। একেক বিধানসভায় রাজনীতির বোঝাপড়া একেকরকম। আজ নজরে আলিপুরদুয়ার

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, আলিপুরদুয়ার: ‘আরে মানুষের আবেগের কাছে কোনও নেতাগিরি খাটে না…’ প্যারেড গ্রাউন্ডের দিকে ইশারা করে একটানা কথাগুলো বলে যাচ্ছিলেন ল্যারি বসু। জেলায় একনামে তাঁকে সকলেই চেনেন। মাঠের মাঝে ফেন্সিংয়ের জন্য খোঁড়া গর্তগুলো বোজানো হচ্ছে দেখে তৃপ্তির হাসি দেখা গেল তাঁর মুখে। ফোকলা দাঁতের ফাঁক দিয়ে সেই হাসি অনেক কথাই জানান দিচ্ছিল। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আলিপুরদুয়ারের মানুষ যেমন ভদ্রলোকের কথায় বিশ্বাস করে, তেমনি সেই বিশ্বাস ভাঙলে সরব বা নীরব প্রতিবাদও করতে জানে।’ গুটিগুটি পায়ে ল্যারি এগিয়ে যান কলেজ হল্টের দিকে। সন্ধ্যার চায়ের আড্ডা জমে ওঠে পাড়া থেকে জেলা রাজনীতির খুঁটিনাটি আলোচনায়। কালজানির শীতল হাওয়াতেও চড়তে থাকে রাজনীতির পারদ।

২০২৬-এর নির্বাচনে আলিপুরদুয়ার (Alipurduar) বিধানসভা কেন্দ্র এক বিচিত্র সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র তপ্ত রাজনৈতিক ফল্গুধারা বইছে। সাধারণ মানুষ এখন শুধুই হিসেব মেলাতে ব্যস্ত। ২০২১ সালে আলিপুরদুয়ারের (Alipurduar Information) ভোটাররা বেছে নিয়েছিলেন পদ্মফুলকে। কিন্তু রাজনীতির অদ্ভুত খেলায় জনতার রায়কে অপবিত্র করেছেন বিধায়ক সুমন কাঞ্জিলাল। তাঁর দলবদল কেবল একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে হয়ে থাকেনি, তা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই কেন্দ্রের প্রতিটি ভোটারের কাছে এক নৈতিক প্রশ্নের খতিয়ান। বিশ্বাসঘাতকতার যে কাঁটা সাধারণ মানুষের মনে বিঁধে আছে, তা ঘাসফুল শিবিরের জন্য সুখকর হবে, নাকি পদ্ম শিবিরের সহমর্মিতার পালে হাওয়া দেবে, সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই কেন্দ্রে গেরুয়া শিবিরের রণকৌশল অনেকটা নিভৃতচারিণীর মতো। গোটা বিধানসভা এলাকায় সংঘের কর্মীরা গেরুয়া শিকড় ছড়িয়েছেন। লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে আরএসএস নেতৃত্ব যেভাবে মাটির তলায় পদ্ম চাষের জমি প্রস্তুত করেছে, তা তৃণমূলের চিন্তা অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। স্বচ্ছ ভাবমূর্তির শিক্ষক, সমাজকর্মী এবং বিশেষ কিছু এনজিও’র মাধ্যমে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছানোর যে নিরন্তর প্রয়াস বিজেপি চালাচ্ছে, তা ভোটের ময়দানে নিশ্চিতভাবেই অদৃশ্য শক্তি হিসেবে গেরুয়া রং ছড়াবে। প্রকাশ্যে না এলেও বিজেপির শক্তিশালী যুব সংগঠন এই মুহূর্তে তাদের অন্যতম তুরুপের তাস। শাসকদলের হুমকি উপেক্ষা করে গত এক বছরে আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকে যেভাবে যুব মোর্চা সংগঠিত হয়েছে তা এই কেন্দ্রে পদ্ম শিবিরের বাড়তি পাওনা।

অত্যাধুনিক হাসপাতাল সহ নানা কারণে রেলশহর আলিপুরদুয়ারের মানুষের মনে দীর্ঘদিনের যে বঞ্চনার ক্ষোভ ছিল, বন্দে ভারতের স্টপ বা অমৃত ভারত প্রকল্পের ছোঁয়ায় তা অনেকটাই প্রশমিত। নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশনের আধুনিকীকরণ সাধারণ মানুষের মনে এক নতুন স্বপ্ন তৈরি করেছে, যা সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের সাফল্যের খাতায় জমা হচ্ছে। তবে জয়ী প্রার্থীকে ধরে রাখতে না পারার গ্লানি বিজেপিকে এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

অন্যদিকে, শাসক শিবিরের অন্দরমহল এখন এক ভাঙা আয়নার মতো, সেখানে প্রতিবিম্বও বারবার খণ্ডিত হচ্ছে। গোষ্ঠীকোন্দলের যে বিষবৃক্ষ এখানে ডালপালা মেলেছে, তা তৃণমূলের জয়ের পথে সবথেকে বড় অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে। জেলা সভাপতি প্রকাশ চিকবড়াইক এবং চেয়ারম্যান গঙ্গাপ্রসাদ শর্মার এক মেরু, আর প্রাক্তন বিধায়ক সৌরভ চক্রবর্তীর অন্য মেরু- এই দুই মেরুর ঠান্ডা যুদ্ধ এখন প্রকাশ্যে এসে পড়েছে। জেলা পার্টি অফিসের দখল নিয়ে যে অলিখিত লড়াই চলছে, তা নীচুতলার কর্মীদের বিভ্রান্ত করছে। আপাতত সৌরভের ঘনিষ্ঠ বৃত্তেই রয়েছেন আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের নেতা মনোরঞ্জন দে, শহরের নেতা দীপ্ত চট্টোপাধ্যায়ের মতন অনেকেই। মৃদুল গোস্বামীদের মতো অভিজ্ঞ মুখেরা এখন দলের মূল স্রোত থেকে খানিকটা বিচ্ছিন্ন। তিনি সেই অর্থে কোনও শিবিরে নাম না লেখালেও জেলার অফিশিয়াল লবির পছন্দের তালিকাতেও নেই।

এর মাঝে সুমন কাঞ্জিলাল এক নিঃসঙ্গ দ্বীপের মতো নিজের আলাদা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের চোখে তিনি আজও একজন ‘দলবদলু’। মানুষের এই ক্ষোভকে প্রশমিত করার মতো রসদ বর্তমানে তাঁর ভাঁড়ারে নেই বললেই চলে। ব্যবহার ভালো, মিশুকে, দম্ভ নেই- মানুষজন সুমনের এইসব গুণের কদর করলেও তাঁকে চটজলদি বিশ্বাস করতে চাইছেন না। সুমনের সঙ্গে গঙ্গার খানিকটা বোঝাপড়া থাকলেও প্রকাশের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব আছে। এই ত্রিমুখী বা চতুর্মুখী লড়াইয়ের আবহে পুরসভার চেয়ারম্যান প্রসেনজিৎ করের অবস্থান বেশ কৌতূহলী। তিনি প্রদীপের তলায় অন্ধকারের মতো নিজেকে সব গোষ্ঠী থেকে সরিয়ে রেখে এক নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছেন। এই গোষ্ঠীকোন্দলের টানাটানিতে, তৃণমূল ভবন থেকে বন্ধ খামে প্রার্থী হিসাবে তাঁর নাম চলে আসাটাও বিচিত্র নয়। কিন্তু সমস্যাটা হল আবেগ আর অঙ্কের। আলিপুরদুয়ারের রাজনীতি সবসময়ই একটু বেশি সংবেদনশীল। চটজলদি উন্নয়নের চেয়েও এখানকার মানুষ রাজনৈতিক আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেন। সেখানে দাঁড়িয়ে সুমনের দলবদল তৃণমূলের জন্য ‘প্রাপ্তি’ নাকি ‘বোঝা’, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থেকেই যায়।

এই কেন্দ্রে সাধারণ তৃণমূল সমর্থকদের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন সুবিধাভোগী কয়েকজন শিক্ষক ও ঠিকাদার নেতা। ওই নেতারা যখন যে গোষ্ঠী বা ব্যক্তি পদে থাকেন তাঁর অনুগামী হয়ে ছড়ি ঘোরান এবং নিজেদের স্বার্থ বুঝে নেন। জনসমর্থন বলতে তাঁদের কিছুই নেই। ওই সুবিধাভোগীরাই নানাভাবে গোষ্ঠীকোন্দল জিইয়ে রেখে দলের সর্বনাশ করছেন বলেই মত গ্রাম, শহরের বহু সাধারণ তৃণমূল সমর্থকের। এই ক্ষোভ ভোটবাক্সে কমবেশি প্রভাব ফেলবে।

একদিকে সংঘের নিভৃত কর্মযজ্ঞ আর রেলের প্রাপ্তি-যোগ, অন্যদিকে তৃণমূলের অন্দরের লড়াই আর দলবদলের তিক্ততা- এই দুইয়ের টানাপোড়েনে আলিপুরদুয়ার বিধানসভায় সুবিধাজনক জায়গায় নেই শাসকদল। অন্য কেন্দ্রের তুলনায় এই কেন্দ্রে সংখ্যালঘু ভোট অনেকটা কম হওয়ায় ভোট অঙ্কের জটিলতাও কম। বাম, কংগ্রেস অস্তিত্বহীন না হলেও হিসেব ওলটপালট করে দেবার মতো ভোট আপাতত তাদের কাছে নেই। তবে এটুকুই বলা যায়, আসন্ন নির্বাচনে লড়াইটা কেবল প্রতীকের হবে না।

ভোটারদের নীরবতা অনেক সময় বড় ঝড়ের পূর্বাভাস দেয়, আলিপুরদুয়ারে ভোটের (Bengal Election 2026) বাতাস কিন্তু তেমন থমথমে নয়। অন্য কেন্দ্রের তুলনায় এই কেন্দ্রে রাজনীতি নিয়ে সাধারণ মানুষজন অনেক বেশি খোলামেলা আলোচনা করেন। দুপুরে কলেজপাড়ার ক্যারমের আড্ডা সেকথাই জানান দিল। ভোটের আলোচনার মাঝেই প্রতিপক্ষের দিকে স্ট্রাইক ঠেলে দিয়ে বছর পঁচিশের তরুণ বলে উঠলেন, ‘নেতার খাই না পরি? যা ঠিক তাই বলব। যে ঠিক বলবে তাকেই ভোট দেব।’ ইদানীং সময়ে এই ছবি অন্য জেলায় দেখা মুশকিল।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *