ভাস্কর শর্মা, ফালাকাটা: কোনও স্কুল নিয়ম মেনে চালাতে গেলে প্রথমেই রাজ্য সরকারের কাছ থেকে ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ বা এনওসি নেওয়া বাধ্যতামূলক। এরপর স্কুল চালানোর জন্য প্রয়োজন হয় রাজ্য সরকারের নিজস্ব বা অন্য কোনও স্বীকৃত বোর্ডের অনুমোদন। কিন্তু আলিপুরদুয়ার (Alipurduar) জেলায় এমন অসংখ্য বেসরকারি স্কুল চলছে, যেগুলির বৈধ অনুমোদন বা এনওসি নেই। পাশাপাশি, মানা হচ্ছে না জাতীয় শিক্ষানীতি। জেলাজুড়ে এমন প্রায় ২৯৪টি বেসরকারি স্কুলের বিরুদ্ধে এবার কড়া ব্যবস্থা নিতে চলেছে স্কুল শিক্ষা দপ্তর। বৈধ এনওসি ছাড়া চলা এই স্কুলগুলিতে সরাসরি পরিদর্শন শুরু করবে দপ্তরের প্রতিনিধিদল। নজরদারি নিখুঁত করতে, পরিদর্শনের রিপোর্ট ও জিও-ট্যাগ করা ছবি ‘এম-পরিদর্শন’ অ্যাপে আপলোড করা হবে। নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললেই স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
গোটা বিষয়টি নিয়ে আলিপুরদুয়ার জেলা স্কুল পরিদর্শক (প্রাইমারি) লক্ষণা গোলের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও, তিনি ফোন না ধরায় কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তবে জেলা শিক্ষা দপ্তরের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, খোদ ডিআই-এর নেতৃত্বেই একটি পরিদর্শক দল জেলার বেসরকারি স্কুলগুলিতে গিয়ে সব খুঁটিয়ে দেখবে। পর্যালোচনা করে শিক্ষা দপ্তরে রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে। শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো বিষয়টিকে অত্যন্ত জরুরি হিসেবে বিবেচনা করেই এই পরিদর্শন শুরু হচ্ছে।
অভিযোগ, আলিপুরদুয়ার জেলাজুড়েই তৃণমূল সরকারের আমলে ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য বেসরকারি বিদ্যালয় গজিয়ে উঠেছে। কোচিং সেন্টার বা টিউশন ক্লাসের মতো করে বিদ্যালয়গুলি চালানো হচ্ছে। সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয় না। স্বীকৃতি ছাড়াই চলা বিদ্যালয়গুলির বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের আলোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই ফালাকাটা নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ফালাকাটায় খাতায়-কলমে ২৪টি স্কুলের অস্তিত্ব থাকলেও, বাস্তবে কোনও পড়ুয়া নেই। স্কুলগুলি বিগত সরকারের আমলে ‘বাংলা শিক্ষা’ পোর্টালে যে তথ্য জমা করেছিল, বাস্তবের সঙ্গে তার কোনও মিল নেই।
শিক্ষা দপ্তর সূত্রে খবর, গত ২২ জুলাই নির্দেশিকায় জানানো হয়, অবিলম্বে বেসরকারি স্কুলগুলির তথ্য যাচাই করে পরিদর্শনে যেতে হবে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। জেলার বেসরকারি স্কুলের তালিকা তৈরি করে স্কুলের নাম, বোর্ডের অনুমোদন, ইউডাইস কোড, অনুমোদনের অবস্থা ও পরিচালনার ধরন খতিয়ে দেখতে হবে। ছাত্রছাত্রী ভর্তি, শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত, শিক্ষক সংখ্যা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, পানীয় জল, শৌচাগার, গ্রন্থাগার, পরীক্ষাগার, খেলার মাঠ, শিশু-সুরক্ষা এবং আরটিই আইনের বিধি মানা হচ্ছে কি না, সব খতিয়ে দেখতে হবে। আলিপুরদুয়ারে এই পরিদর্শন কয়েকদিনের মধ্যেই শুরু হচ্ছে। ফলে এনওসি-বিহীন স্কুলগুলির কর্তৃপক্ষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
আলিপুরদুয়ারের এক স্থানীয় শিক্ষক প্রতাপ বসুর কথায়, ‘বেশিরভাগ বেসরকারি বিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিকাঠামো নেই। অনেক পরিবার বেসরকারি স্কুলে সন্তানদের পড়ালেও, সরকারি বিদ্যালয়ে নাম লিখিয়ে রাখেন। অন্য স্কুলে ভর্তির সময় টিসি বা ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নেওয়ার জন্য সরকারি বিদ্যালয়ে আসেন। কারণ, অধিকাংশ বেসরকারি বিদ্যালয়ের বৈধ টিসি দেওয়ার কোনও অধিকার বা মানদণ্ড নেই। বিদ্যালয়গুলি শুধুমাত্র রোজগারের জন্য খোলা হয়েছে। তাই শিক্ষা দপ্তরের উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়।’
একটি বেসরকারি স্কুলের মালিক নারায়ণ কুণ্ডু বলেন, ‘আমরা একটি ছোট স্কুল চালাই। আমাদের বিদ্যালয়ে পড়ুয়ার সংখ্যা খুবই কম। স্কুল পরিচালনা ও শিক্ষকদের বেতন দিতেই আয়ের সব টাকা চলে যায়। এখন সরকার নানা ধরনের শর্ত আরোপ করছে। এতে আমাদের মতো ছোট বহু নার্সারি স্কুল উঠে যাবে বলেই মনে করছি।’

