Alaska Survival | চোখের সামনে দুই প্রিয়জনকে হারালেও হারায়নি মনোবল, আলাস্কার বরফ জলে ৬২ ঘণ্টা লড়াই চালিয়ে প্রাণে বাঁচল ডেরেক

শিক্ষা
Spread the love


উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: চোখের পলকে কখন জীবনটা ওলটপালট হয়ে যায়, তা কেউ জানে না। আলাস্কার (Alaska) সাভুঙ্গা এলাকার পনেরো বছরের কিশোর ডেরেক পার্কার আগনাঙ্গা (Derek Aghanga) হয়তো কখনও ভাবতেও পারেনি, সাগরে মাছ ধরার এক সাদামাটা রোববারের বিকেল তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন হয়ে নামবে। মাথার ওপর খোলা আকাশ, আর চারদিকে কেবল ক্রুদ্ধ জলরাশি। তার মাঝেই মৃত্যুর মুখ থেকে একেবারে ছিনিয়ে আনা হয়েছে একটি তরুণ প্রাণকে। টানা বাষট্টি ঘণ্টা (Teen Survives 62 Hours)—কথায় কত কম, কিন্তু এই সময়টুকুর মধ্যে প্রতিটি মুহূর্তে যে মৃত্যুর দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে থাকে, তা টের পেয়েছিলেন কেবল ওই কিশোর।

গল্পটা শুরু হয়েছিল গত ৫ সেপ্টেম্বর। পরিবারের মায়া কাটিয়ে, জীবিকার টানে বা নিছক শখের বশে বড় দাদা সিডনি এবং এক খুড়তুতো ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ছোট নৌকায় চেপে সাগরে পাড়ি দিয়েছিল ডেরেক। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম বড় নির্মম। মাঝসমুদ্রে আচমকাই নৌকার প্রপেলারের সঙ্গে জড়িয়ে যায় মাছ ধরার একটি মোটা দড়ি। মুহূর্তের মধ্যে বিকল হয়ে পড়ে ইঞ্জিন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আবহাওয়া উগ্র রূপ ধারণ করে। উত্তাল ঢেউয়ের ধাক্কায় চোখের পলকে উলটে যায় তাদের আঠারো ফুটের ছোট্ট নৌকাটি।

এরপর যা ঘটেছিল, তা কোনো থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানায়। হিমশীতল জলের প্রবল টানে নৌকার নিচে আটকে পড়ে চিরকালের মতো হারিয়ে যান ডেরেকের বড় দাদা সিডনি। আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে সাঁতরে পার হওয়ার চেষ্টা করা খুড়তুতো ভাইটিও তলিয়ে যায় চোখের নিমিষে। নিজের রক্তমাংসের দুই মানুষকে ওই অতল জলের নিচে হারিয়ে ফেলা এক পনেরো বছরের কিশোরের কাছে কোন মাত্রার মানসিক আঘাত, তা কেবল কল্পনাই করা যায়। কিন্তু ভেঙে পড়ার সময় বা বিলাসিতা তখন ডেরেকের ছিল না। চার ডিগ্রির কাছাকাছি তাপমাত্রার সেই বরফগলা জলে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সে কোনোমতে উঠে বসে উলটে যাওয়া ওই নৌকার খোলের ওপর।

হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, এক ফোঁটা খাবার নেই, পান করার মতো একবিন্দু জল নেই—এমন চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দীর্ঘ দুই রাত আর তিনটে দিন কেটেছে তার একটানা একা। পরে উদ্ধারকারীদের কাছে ডেরেক জানিয়েছে, ভয়ের চোটে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলেও সে হার মানেনি। মনে মনে শুধু প্রার্থনা করে গেছে আর বিশ্বাস রেখেছিল যে কেউ না কেউ তাকে বাঁচাতে আসবেই। উলটে যাওয়া নৌকার খোল আঁকড়ে ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে কাটিয়ে দিয়েছে তুষারঝড় আর জলরাশির সঙ্গে লড়াই করে।

অবশেষে ৭ সেপ্টেম্বর সকালেই দেবদূতের মতো দেখা মেলে মার্কিন কোস্ট গার্ডের একটি উদ্ধারকারী বিমানের। সেন্ট লরেন্স দ্বীপের কাছে মাঝসমুদ্রে ওই উলটে যাওয়া কাঠামোর ওপর একটি উজ্জ্বল রঙের জ্যাকেট পরা ক্লান্ত শরীরকে দেখতে পান পাইলটরা। সঙ্গে সঙ্গে বার্তা পাঠানো হয় কাছাকাছি থাকা একটি রিসার্চ ভেসেল বা গবেষণামূলক ও মাছ ধরার জাহাজে। জাহাজের কর্মীরা তৎপরতার সঙ্গে লাইফলাইন বা দড়ি ছুড়ে দিয়ে টেনে তোলেন ডেরেককে।

জাহাজের ক্যাপ্টেন অ্যাডাম হোয়াইট পরবর্তী সময়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে বলতে গিয়ে শিউরে উঠেছেন। তাঁর কথায়, উদ্ধার করার সময়ও ঠান্ডায় ডেরেকের দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছিল, শরীর কাঁপছিল থরথর করে, তবুও তার ভেতরে বাঁচার যে জেদ দেখা গিয়েছিল তা সত্যিই বিরল। এক্সট্রিম হাইপোথার্মিয়া এবং তীব্র ডিহাইড্রেশনের শিকার হয়ে আধা-চেতন অবস্থায় থাকলেও সে হার মানেনি। তৎক্ষণাৎ তাকে এয়ারলিফট করে নিরাপদ স্থানে এবং পরে স্থানীয় হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তরিত করা হয়।

পরিবারের কাছে সে ফিরে এসেছে ঠিকই, কিন্তু দুই প্রিয়জনকে হারানোর ক্ষত সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে তাকে। প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে মানুষের বেঁচে থাকার স্পৃহা কতটা প্রবল হতে পারে, ডেরেকের এই ফিরে আসা যেন তারই এক উজ্জ্বল এবং জীবন্ত দলিল।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *