উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ দিল্লির যন্তর মন্তরে আরশোলাদের আন্দোলন এবং অনশনের সেই উত্তাল দিনগুলির পর, ঘটনার এক মাস কাটতে না কাটতেই দুদিনের কলকাতা সফরে এসে নিজের শিকড় ও আদর্শের কথা খোলাখুলি জানালেন আইসার (AISA president Neha Bora) সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরা। মঙ্গলবার রামমোহন লাইব্রেরির সভামঞ্চ থেকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নেহা সগর্বে তুলে ধরেন তাঁর ‘বং কানেকশন’-এর কথা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ির মাটি এবং বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশই তাঁকে প্রথম দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে দূরত্ব বজায় রাখতে শিখিয়েছিল।
মূলত উত্তরাখণ্ডের ভূমিকন্যা হলেও বাবার সেনাবাহিনীতে চাকরির সুবাদে শৈশবে শিলিগুড়িতে চলে আসতে হয় নেহাকে। শিলিগুড়ির স্কুলেই তাঁর মাধ্যমিক, একাদশ ও উচ্চ মাধ্যমিকের পড়ালেখা সম্পন্ন হয়। রামমোহন লাইব্রেরির মঞ্চে সেই স্মৃতির রোমন্থন করে নেহা বলেন, ‘‘বাংলার মাটিতে না এলে হয়তো আমি চারু মজুমদারের নাম জানতে পারতাম না, পাবলো নেরুদার কবিতা পড়তাম না বা অরুন্ধতী রায়কে চিনতে পারতাম না। এই মাটিই আমাকে প্রথম দক্ষিণপন্থার থেকে দূরত্ব তৈরি করতে শিখিয়েছিল।’’ কাকতালীয়ভাবে, শিলিগুড়ির ঠিক পাশেই অবস্থিত নকশালবাড়ি হলো চারু মজুমদারের উত্থানভূমি। আর মঙ্গলবার নেহার এই বক্তব্যের সময় সভাকক্ষেই উপস্থিত ছিলেন চারু মজুমদারের পুত্র তথা সিপিএমএল (লিবারেশন)-এর রাজ্য সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদার।
মাস তিনেক আগেই পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। দীর্ঘ জমানার অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে প্রথমবার সরকার গড়েছে বিজেপি। সেই প্রসঙ্গ টেনে নেহা বলেন, ‘‘দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের মতোই আমরাও এতে হতাশ হয়েছিলাম।’’ গত ১৫ বছরের তৃণমূল জমানার রাজনৈতিক হতাশার ফলস্বরূপই রাজ্যে বিজেপির এই জয় এসেছে বলে তাঁর মত। তবে একই সঙ্গে তিনি হুঙ্কার দিয়ে বলেন, ‘‘বাংলার পুনরুত্থান কখনওই বিজেপির হাত ধরে হবে না।’’
এদিনের আইসা আয়োজিত সমাবেশে বৃহত্তর বাম ছাত্র ঐক্যের পাশাপাশি ‘আন্দোলনের ঐক্য’-এর বার্তা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে নেহা ছাড়াও বক্তব্য রাখেন আরজি কর আন্দোলনের অন্যতম মুখ তথা জুনিয়র ডাক্তার ফ্রন্টের নেতৃত্ব দেবাশিস হালদার, যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা মঞ্চের মেহবুব মণ্ডল, এসএফআইয়ের রাজ্য সভাপতি প্রণয় কার্য্যী এবং ডিএসও-র রাজ্য সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায়।
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফাকে আন্দোলনের প্রথম ধাপ হিসেবে অভিহিত করে নেহা বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রকৃত বদল না আসা পর্যন্ত এই আন্দোলন থামবে না। তাঁর মতে, ভয়কে জয় করে এই চলমান আন্দোলন প্রতিদিন নতুন শক্তি অর্জন করছে, কারণ এটি শুধু একজনকে সিংহাসনচ্যুত করেনি, বরং ৫৬ ইঞ্চি ছাতির অহংকারকে পরাস্ত করেছে। এসএফআইয়ের পক্ষ থেকে এ দিন নেহার হাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ বার্তা সংবলিত একটি ছবিও তুলে দেওয়া হয়।
রামমোহন লাইব্রেরির অনুষ্ঠানের আগে কলকাতা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক বৈঠকে যোগ দেন নেহা। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রায় এক দশক ধরে বন্ধ থাকা ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জোরালো দাবি তোলেন তিনি। এর আগে রাঁচীতে ছাত্র আন্দোলনের সংহতি কর্মসূচিতে যাওয়ার সময় নেহার গায়ে কালি ছোঁড়ার ঘটনা ঘটেছিল। সেই কারণে কলকাতার এই সফরে তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয় লিবারেশন নেতৃত্ব। কখনও কালো ওড়নায় মাথা ঢাকা দিয়ে, আবার কখনও কঠোর মানবশৃঙ্খল ও একাধিক গাড়ির কনভয়ের নিরাপত্তায় তাঁকে যাতায়াত করতে দেখা যায়। কারণ রামমোহন লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠান চলাকালীনই চত্বরে ‘দেশদ্রোহী এসএফআই-আইসা গো ব্যাক’ লেখা পোস্টারও ছড়িয়ে পড়তে দেখা গিয়েছিল। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী বুধবার বরানগর আইএসআই-এর (ISI) কর্মসূচি সেরে তাঁর দিল্লি ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে।

