হিলির সেই রাত, বিস্মৃত বিপ্লবের ইতিহাস

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


উত্তরবঙ্গের বিপ্লবীদের অভিযান, বিচার ও দীর্ঘ কারাবাসের কাহিনী আজও যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি।

সনাতন পাল

ভারতবর্ষে স্বাধীনতার আন্দোলন তখন তীব্র। ১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ ভগৎ সিং, রাজগুরু ও সুখদেবের ফাঁসি তরুণদের মনে আরও আগুন জ্বেলেছিল। বাংলাতেও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার অভিযানের পর বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনে গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বল, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্তের মতো তরুণ বিপ্লবীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। জালালাবাদ পাহাড়ে সংঘর্ষে প্রাণ যায় একাধিক বিপ্লবীর। সূর্য সেন ১৯৩৩ সালে ধরা পড়েন এবং পরের বছর ফাঁসিতে মৃত্যুবরণ করেন। অসুস্থতার কারণে ইউরোপে চিকিৎসার অনুমতি পাওয়া সুভাষচন্দ্র বসুও ১৯৩৩ সালে ভিয়েনায় চিকিৎসা করাতে করাতে ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় উত্তরবঙ্গেও বিপ্লবী সংগঠনগুলির অর্থসংগ্রহ ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

২৮ অক্টোবর, ১৯৩৩। তৎকালীন পূর্ববঙ্গ রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন হিলি। উত্তরবঙ্গ থেকে সংগৃহীত রাজস্ব ও সরকারি ডাক কলকাতায় পাঠানোর কাজে দার্জিলিং মেল গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই ব্যবস্থাকে ঘিরেই হিলি স্টেশনে ডাকের সিন্দুক ও সরকারি নগদ অর্থ লুটের পরিকল্পনা করেন বিপ্লবীরা। আদালতের নথিতে ঘটনাটির উদ্দেশ্য হিসেবে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থসংগ্রহের কথা উঠে এসেছে। রাতের অভিযানে বিপ্লবীরা স্টেশনে ঢুকে ডাকের সিন্দুকের চাবি দাবি করেন, রেলকর্মীদের বাধা দেন এবং নগদ অর্থ ও ডাকের সামগ্রী নিয়ে সরে পড়েন। গুলিতে ডাক বিভাগের কর্মী কালীচরণ মাহালি আহত হন। চিকিৎসার জন্য তাঁকে প্রথমে পার্বতীপুর, পরে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হলেও তাঁর মৃত্যু হয়। আদালতের নথিতে আরও কয়েকজন রেলকর্মী ও কর্মচারীর আহত হওয়ার বিবরণ রয়েছে।

অভিযানের পর পুলিশ তল্লাশি শুরু করে। ১৫ জনের মধ্যে ১৩ জন গ্রেপ্তার হন। বাকিদের খোঁজে বিভিন্ন এলাকাতেও তল্লাশি চলে। ঘটনাটি ‘হিলি রেল ডাকাতি মামলা’ নামে পরিচিত হয়। ১৯৩৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর কলকাতা হাইকোর্টে মামলার আপিলের রায়ে প্রথম বিচারের মৃত্যুদণ্ডের সাজা বদলে যায়। প্রাণকৃষ্ণ চক্রবর্তী ও হৃষীকেশ ভট্টাচার্যের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের সাজা হয়। সত্যব্রত চক্রবর্তী, সরোজকুমার বসু এবং প্রফুল্লনারায়ণ সান্যালের দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। অন্য কয়েকজনের সাজা সাত বা পাঁচ বছরের কারাদণ্ডে নির্ধারিত হয়, কালীপদ সরকার খালাস পান। আপিলের শুনানিতে বিপ্লবীদের পক্ষে আইনজীবীরা যুক্তি পেশ করেন। মামলার নথিতে আত্মগোপন, আশ্রয় দেওয়া এবং পুলিশের হাতে তথ্য পৌঁছানোর ঘটনাও উঠে এসেছে।

ঔপনিবেশিক শাসনে ‘দ্বীপান্তর’ ছিল কঠোর শাস্তির প্রতীক। কারাগারে নির্বাসন, দীর্ঘ কারাবাস, শারীরিক নির্যাতন এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা বিপ্লবীদের জীবনের বাস্তবতা ছিল। হিলি অভিযানের সঙ্গে যুক্তদের কাহিনী তাই শুধু অর্থ লুটের ঘটনা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বাধীনতার জন্য গোপন সংগঠন চালানো, ঝুঁকি নেওয়া, গ্রেপ্তার, বিচার এবং দীর্ঘ শাস্তির ইতিহাস। দিনাজপুরের বিপ্লবী আন্দোলনের এই অধ্যায় উত্তরবঙ্গের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিস্তৃত ইতিহাসের অংশ। অথচ জনস্মৃতিতে এর পরিচিতি এখনও সীমিত। ২০২০ সালে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা পুলিশের উদ্যোগে হিলি অভিযানের বার্ষিকীতে বিপ্লবীদের স্মরণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ স্মরণের উদ্যোগ একেবারে নেই, এমন বলা যায় না। প্রয়োজন আরও ধারাবাহিক ও বিস্তৃত স্বীকৃতি।

আজকের হিলি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দুই পাশে বিস্তৃত। দেশভাগের পর ঐতিহাসিক রেলস্টেশনটি বাংলাদেশের দিকে পড়েছে, আর ভারতীয় অংশে বালুরঘাট নিকটতম রেলস্টেশন। এই ভূগোলই হিলির ইতিহাসকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। স্বাধীনতার ইতিহাস কেবল কলকাতা, চট্টগ্রাম বা মেদিনীপুরের বড় ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়, প্রত্যন্ত জনপদের তরুণদের আত্মত্যাগও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই হিলি অভিযানের সঙ্গে যুক্ত বিপ্লবীদের নাম, পরিবার, সংগঠন ও বিচার নিয়ে আরও গবেষণা দরকার। ২৮ অক্টোবরকে স্থানীয় স্মরণ দিবসের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হওয়া উচিত। হিলির সেই রাত আজও মনে করিয়ে দেয়- স্বাধীনতার ইতিহাস সম্পূর্ণ হয় না, যত দিন না বিস্মৃত বিপ্লবীদের অবদান যথাযথভাবে সামনে আসে।

(লেখক শিক্ষক ও অক্ষরকর্মী। বালুরঘাটের বাসিন্দা।)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *