মৈনাক কুন্ডা
গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের সেই সময়টাতে আমরা উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। তখন পাহাড় বেশ অশান্ত। তার আঁচ ডুয়ার্স ও তরাইয়ের ভূগোলেও এসে পড়ছিল। আমরা সেই অশান্তি বেশ টের পাচ্ছিলাম। আমাদের বেশ মনে পড়ে, ক্যাম্পাসে তখন ক্লাস এইটের ছাত্র সোনম শেরপার নাম অনুরণিত হত। পাহাড়ের আন্দোলনে তাদের পরিবার রাজ্যের অখণ্ডতার পক্ষে থাকায় প্রাণ দিয়ে তার মূল্য চোকাতে হয়েছিল এবং সোনম শহিদ হয়েছিল। ক্যাম্পাসের মিছিলে দিবাকর দাজু স্লোগান তুলতেন আর সমতলের ছেলেমেয়েরা তাতে গলা মেলাত— ‘নেপালি ভাষালাই সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিনু পড়ছ’।
আঞ্চলিক আন্দোলনের সুলুকসন্ধান
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে আটের দশক আঞ্চলিকতাবাদের স্বর্ণযুগ ছিল। ভারতবর্ষের কোনায় কোনায় মানুষ বলছিলেন— অনেক হয়েছে বাপু তোমাদের শাসন, এবার আমাদের হিসেবে আমাদের বুঝে নিতে দাও। মানুষ উপলব্ধি করছিলেন যে, সরকারের নানা দপ্তর ও নিয়মিত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা সত্ত্বেও তাঁদের রোটি-কাপড়া-মকানের সমস্যা তীব্রতর হচ্ছে। শিক্ষা ও চিকিৎসা সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছিল। কর্মসংস্থান শুধু ভোটের ভাষণেই সীমাবদ্ধ থাকত। চালু পদ্ধতির প্রতি মানুষের অসন্তোষ এবং অঞ্চলে অঞ্চলে উন্নয়নের ভীষণ অসাম্য দেশের কোনায় কোনায় আঞ্চলিকতা আন্দোলনের বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছিল।
১৯৮৫ সালে অসম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ‘জয় আই অহম’ স্লোগানে আগের পাঁচ বছর অসমজুড়ে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন চলেছিল। চুক্তির পর অসম গণপরিষদ বিপুল ভোটে জিতে অসমের শাসনভার পায়। আন্দোলনের নেতা প্রফুল্লকুমার মহন্ত যখন মুখ্যমন্ত্রী হন, তখনও তাঁর গায়ে ছাত্রসুলভ গন্ধটি যায়নি। একই ছবি মিজোরামেও দেখা গিয়েছিল। ১৯৮৬ সালে মিজো চুক্তি স্বাক্ষর হয়। তার আগে প্রায় ১৫ বছর ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চেয়ে সশস্ত্র আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন মিজো নেতা লালডেঙ্গা। চুক্তির ফলশ্রুতিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রাক্তন সদস্য লালডেঙ্গা মিজোরামের প্রথম নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীর পদে উন্নীত হন।
এই আটের দশকেই ১৯৮৪ সালে পঞ্জাবে ‘অপারেশন ব্লু স্টার’ ঘটেছিল, যেখানে স্বর্ণমন্দির থেকে উগ্রপন্থীদের উৎখাত করতে সেনাবাহিনী সশস্ত্র অভিযান চালায়। এর পরিণতিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি নিজ বাসগৃহেই গুলিতে নিহত হন। কিন্তু তার আগের কয়েক বছর পঞ্জাবে সশস্ত্র খালিস্তান আন্দোলন চলছিল। তাদেরও সেই এক দাবি ছিল যে, আলাদা খালিস্তান চাই। বিহারে ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশে উত্তরাখণ্ড ও হরিতাঞ্চল, মধ্যপ্রদেশে ছত্তিশগড় এবং অন্ধ্রে তেলেঙ্গানার দাবি তখন উঠছিল। এই দাবিগুলো পরবর্তী সময়ে ২০০০ এবং ২০১৪ সালে সাংবিধানিক সিলমোহর পায়। অসমে এই সময় থেকেই বোড়োল্যান্ডের দাবি উঠতে শুরু করে। আজ অসমে ষষ্ঠ তফশিলের অন্তর্গত তিনটি এবং রাজ্য আইনের অধীনে ছটি অটোনোমাস কাউন্সিল ক্রিয়াশীল রয়েছে।
সুবাস ঘিসিংয়ের রণহুংকার
ইতিহাসের সেই বিশেষ সন্ধিক্ষণে আর এক প্রাক্তন সেনা জওয়ান সুবাস ঘিসিং আওয়াজ তোলেন— ‘হামরো মাটো (মাটি), হামরো সরকার : গোর্খাল্যান্ড-গোর্খাল্যান্ড, ছুট্টাই (আলাদা) গোর্খাল্যান্ড চাহিয়ো, গোর্খাল্যান্ড হামরো অধিকার হো’। তাঁর বলার মধ্যে এবং ‘নো গোর্খাল্যান্ড, নো রেস্ট’ অঙ্গীকারের মধ্যে এমন এক জাদু ছিল, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ নেপালিভাষী মানুষকে উত্তাল করে দিয়েছিল। দার্জিলিং থেকে দলসিংপাড়া এবং কার্সিয়াং থেকে কালচিনি জিএনএলএফ-এর পতাকায় ছেয়ে গিয়েছিল। রাজপথ থেকে মহল্লা পর্যন্ত জিএনএলএফ-এর কুকরি দখল নিয়েছিল। ‘জান দিনছু মান দিনছু, গোর্খাল্যান্ড লিনছু লিনছু’ শপথে মানুষ আত্মবলিদানের পথে নেমেছিলেন। অজস্র মানুষ এই আন্দোলনে প্রাণ হারিয়েছিলেন। তবে সুবাস ঘিসিংকে শেষ অবধি নাকের বদলে নরুন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। ১৯৮৮ সালের ২২ অগাস্ট চুক্তির মাধ্যমে ‘দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল’ গঠিত হয় এবং ঘিসিং তার চেয়ারম্যান হন।
আন্দোলন শুরুর আগে
১৯০৭ সাল থেকে পাহাড় বলে আসছিল যে, তারা আলাদা প্রশাসনিক ব্যবস্থা চায়। ১৯১৭ সালে ‘হিল মেন্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর পক্ষ থেকে গভর্নমেন্ট অফ বেঙ্গলের চিফ সেক্রেটারিকে প্রথম মেমোরান্ডাম দেওয়া হয়। সেখানে দাবি করা হয় যে, দার্জিলিংয়ের মানুষ ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, ধর্ম এবং বর্ণের দিক থেকে বাংলার অন্য অংশ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। এই পার্থক্যকে মান্যতা দিয়ে দার্জিলিংকে বাংলার বাইরে রাখার দাবি জানানো হয়। তখন থেকেই পাহাড় আলাদা হতে চেয়েছে, আর সমতল বলে এসেছে যে দার্জিলিং বাংলার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই দাবি নিয়ে অল ইন্ডিয়া গোর্খা লিগ, কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি আলাদাভাবে বা যৌথভাবে দার্জিলিংয়ের মাটিতে নানারকম কর্মসূচি নিয়েছে।
কিন্তু সুবাস ঘিসিং পাহাড়কে অনেক বেশি নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৮০ সালের ৫ এপ্রিল দার্জিলিংয়ে জিএনএলএফ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অগাস্ট মাসে দলের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধিকে চিঠি দেওয়া হয়। জ্যোতি বসুকে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে দাবি করা হয় যে, ছয় মাসের মধ্যে দার্জিলিং থেকে রাজ্য প্রশাসন প্রত্যাহার করতে হবে। ১৯৮৬ সালের ১৩ মার্চ গোর্খাল্যান্ডের দাবি আদায়ের জন্য মিটিং করে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কাঠ ও পাথর সহ পাহাড়ের মূল্যবান কোনও কিছু বাইরে পাঠানোর ক্ষেত্রে অবরোধ, কর প্রদান বন্ধ, ঋণ পরিশোধ বন্ধ এবং ১৫ অগাস্ট ও ২৬ জানুয়ারির মতো জাতীয় দিবস উদযাপন বন্ধ রাখার ডাক দেওয়া হয়। যারা গোর্খাল্যান্ড দাবি সমর্থন করবে না, সেই দল বা নেতাকে ভোট বয়কট ইত্যাদির মাধ্যমে ‘ডু অর ডাই’ কর্মসূচি নিয়ে ১২-১৪ মে লাগাতার ৭২ ঘণ্টা পাহাড়, ডুয়ার্স ও তরাইয়ে বন্ধ ডাকা হয়।
পৃথক রাজ্যের দাবিতে তখন আগুন জ্বলেছিল। অবশেষে ১২০০ জীবন ও অজস্র সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের বিনিময়ে ১৯৮৮ সালের ২২ অগাস্ট দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল গঠনের চুক্তির মাধ্যমে সেই আন্দোলন এসে থামল। পাহাড়ের ক্ষমতা এখন সুবাস ঘিসিং থেকে বিমল গুরুং হয়ে অনীত থাপার কবজায় চলে গিয়েছে। হিল কাউন্সিলের জায়গা এখন গোর্খা টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নিয়েছে। জিএনএলএফ ও জিজেএম আজ গোর্খা লিগের মতোই ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছে। বর্তমানে সেখানে ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
স্বপ্ন বনাম বাস্তব
আঞ্চলিকতাবাদের মূল মন্ত্র হল স্বপ্ন ফেরি করা। এক সোনালি সকালের স্বপ্ন তারা দেখায়। সেই কোনকালে বিদ্রোহী কবি বলেছিলেন, ‘ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত একটু নুন’। স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা মানুষকে আশ্বাস দিয়ে যান যে, সিস্টেমের রিমোট কন্ট্রোল হাতে এলেই শুধু গরম ভাত নয়, মাঝেমধ্যে পোলাও জুটবে। কিন্তু বাস্তবে কি তা-ই হয়? হিল কাউন্সিল বা টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ইতিহাস কিন্তু উলটো কথা বলে। সরকারি টাকা এমনভাবে ব্যয় করা হয়েছে যে, কর্তৃপক্ষ সময়মতো তার হিসেব দিতে পারেনি। শিল্প উন্নয়নের যে বেলুন ফোলানো হয়েছিল, তা আজ চুপসে গিয়েছে। শিক্ষিত বেকারের চাকরির স্বপ্ন আজও বিশ বাঁও জলে রয়েছে। পাহাড়ের উন্নয়নের হালও তথৈবচ হয়ে আছে। স্বপ্নভঙ্গের বেদনা থেকে হয়তো আবার অন্য কোনও সুবাস ঘিসিং পৃথক গোর্খাল্যান্ডের জঙ্গি আন্দোলন করে ভবিষ্যতে পাহাড়ের মুকুটহীন সম্রাট হয়ে উঠবেন।
(লেখক প্রাক্তন শিক্ষক)
