চার দশকের সফরনামা

চার দশকের সফরনামা

ব্লগ/BLOG
Spread the love


নবেন্দু গুহ

সালটা ছিল ১৯৮৬ এবং তারিখ ছিল ১২ মে। দুপুরে স্নান-খাওয়া সেরে আমি তখন বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। হাতে বিশেষ কোনও খবর ছিল না। সিপিএম নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আগের দিন অর্থাৎ ১১ মে দার্জিলিঙের চকবাজারে মিটিং করেছিলেন এবং রাতেই তিনি কলকাতার উদ্দেশে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন। এদিকে ১২ মে থেকে বাহাত্তর ঘণ্টার দার্জিলিং পাহাড় বনধের ডাক দিয়েছিলেন জনৈক সুবাস ঘিসিং। তাঁর সংগঠনের নাম ছিল ‘গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট’ (জিএনএলএফ)। তখনও পর্যন্ত এই সংগঠনের নাম বা নেতার নাম কেউ কখনও শোনেননি। বুদ্ধদেববাবু অবশ্য স্বভাবসিদ্ধভাবে দার্জিলিঙের জনসভায় এই বনধের ডাকের কড়া সমালোচনা করেছিলেন এবং বনধ সমর্থনকারীদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। সেই সময় রাজ্যে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় ছিল। তাদের আমলে বনধ ডাকা ছিল অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। তার ওপর বারো বা চব্বিশ ঘণ্টার নয়, একেবারে ৭২ ঘণ্টার বনধ ডাকা হয়েছিল। সবাই একে নেহাতই পাগলামি বলে ধরে নিয়েছিলেন এবং আমরাও তাই ভেবেছিলাম।

প্রথম দিনেই পুলিশের গুলি

সাংবাদিকদের ভাগ্যে কি আদৌ ঘুম বা বিশ্রাম জোটে? নকশালবাড়ি এলাকায় বনধ সংক্রান্ত কিছু একটা খবর পাকছে বলে আভাস পাওয়া গেল। কিন্তু কিছুতেই আমরা সেই খবরের নাগাল পাচ্ছিলাম না। এমন সময় হঠাৎই বর্ষীয়ান সাংবাদিক নৃপেন বসুর ফোন এল। তিনি বললেন, ‘নবেন্দু, কিছু খবর পেয়েছ? নকশালবাড়ির দিকে কিছু ঝামেলা হয়েছে। চলো, পানিঘাটার দিকটা ঘুরে আসি।’ পানিঘাটা পৌঁছাতে প্রায় বিকেল হয়ে গিয়েছিল। দোকানপাট সব বন্ধ ছিল এবং বাড়িগুলোর দরজা-জানলাও বন্ধ ছিল। রাস্তায় কোনও লোকজন ছিল না এবং চারিদিকে কেমন যেন থমথমে ভাব ছিল। হঠাৎ দেখলাম, কেউ একজন জানলা খুলে উঁকি মারছে। জিজ্ঞেস করতে সে প্রথমে ইতস্তত করলেও পরে জানাল যে, ওখানে নাকি গুলি চলেছে এবং কয়েকজন মারা গিয়েছেন। এ কথা শুনেই আমার এবং নৃপেনদার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল। আমরা তৎক্ষণাৎ পানিঘাটা পুলিশ ফাঁড়ির দিকে ছুটলাম।

সেখানে গিয়ে বোঝা গেল যে, পরিস্থিতি মোটেই ভালো নয়। ওখানেই আমরা শিলিগুড়ির অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে পেয়ে গেলাম। তাঁকে খুবই চিন্তিত দেখাচ্ছিল এবং তাঁর মুখ কাঁচুমাচু ছিল। আমাদের দেখে তিনি বলে উঠলেন, ‘আপনারা এখানে কী করে এলেন? কোনও খবর নেই।’ নৃপেনদা গলা উঁচিয়ে বললেন, ‘শুনলাম এখানে পুলিশ গুলি চালিয়েছে এবং তিন-চারজন মারা গেছেন।’ শেষমেশ অনেক চাপাচাপির পর পুলিশকর্তা জানালেন যে, পাশের পাহাড়ি টিলার ওপর থেকে বেশ কিছু লোক পুলিশকে লক্ষ্য করে বড় বড় পাথর ছুড়ে আক্রমণ চালায়। তিনি নিজে এবং আরও কয়েকজন পুলিশকর্মী আহত হওয়ার পর পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে গুলি চালানো হয়।

পুলিশকর্তা জানিয়েছিলেন যে, একজন মারা গিয়েছেন। এদিকে এই খবর রটে যাওয়ার পর পাহাড়ে কার্যত বনধ শুরু হয়ে যায়। আর সেখান থেকেই গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের সূচনা হয় এবং গোর্খা নেতা হিসেবে সুবাস ঘিসিংয়ের উল্কাগতিতে উত্থান ঘটে। এতদিন তাঁর কর্মকাণ্ড দেখে যাঁরা সুবাস ঘিসিংকে নিতান্তই পাগল বলে ঠাওরেছিলেন, তাঁরা এবার মত পালটে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনে শামিল হয়ে যান। পৃথক রাজ্যের দাবিতে দার্জিলিঙের পার্বত্য এলাকায় এবং ডুয়ার্সের কিছু জায়গাতে হিংসাত্মক আন্দোলন শুরু হয়ে যায়।

দ্য বল স্টার্টেড রোলিং

পানিঘাটা কাণ্ডের পর ১৯৮৬ সালের ২৫ মে কার্সিয়াংয়ে যে প্রতিবাদ মিছিল বেরোয়, তা হিংসাত্মক হয়ে উঠলে পুলিশ গুলি চালায়। তাতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়। পাহাড়ের সামগ্রিক পরিস্থিতি দিন-দিন আরও বেশি মাত্রায় উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকে। পাহাড়ে সেই সময় সিপিএমের যথেষ্ট দাপট ছিল। গোর্খা লিগ এবং কংগ্রেস পাহাড়ে অনেকটাই শক্তিধর হলেও এই দুই দলের নীচের তলার কর্মী ও সমর্থকরা জিএনএলএফ-এর ছাতার তলায় ভিড়ে যেতে থাকেন। সুবাস ঘিসিংয়ের আন্দোলন ছিল পৃথক রাজ্যের দাবিতে, আর সিপিএম ছিল তার ঘোরতর বিরোধী। ফলে পাহাড়জুড়ে কার্যত ভ্রাতৃঘাতী আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। বেশ কিছু বছর ধরে পাহাড়ে সিপিএমের অস্তিত্ব কার্যত নেই। কিন্তু গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের শুরুর সময়টায় পাহাড়ে সিপিএমের কয়েকজন মারকুটে নেতা ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মান সিং রাই। তাঁর নেতৃত্বে সিপিএম সমর্থকরা গোর্খাল্যান্ডপন্থীদের মারধর করতেন। মান সিং রাইকে নিয়ে পাহাড়ের মায়েদের মধ্যে সিনেমার গব্বর সিংয়ের মতো কাহিনী চালু ছিল— ‘জব রাত মে বাচ্চা রোতা হ্যায় তো মা কহতি হ্যায়, সো যা বেটা, নেহি তো মান সিং আয়েগা।’

কিন্তু জিএনএলএফ নেতা-কর্মীদের প্রচণ্ড দাপটে সিপিএম কার্যত ধুলোয় লুটিয়ে গেল। জ্যোতিবাবু ও বুদ্ধদেববাবুদের তখন রীতিমতো বেহাল দশা হয়েছিল। কিছুতেই সুবাস ঘিসিংকে বাগে আনা যাচ্ছিল না। ব্যাপক হিংসাত্মক আন্দোলনে গোটা পাহাড় জেরবার হয়ে পড়েছিল। এদিকে ১৯৮৬ সালের ২৭ জুলাই কালিম্পংয়ে পুলিশি অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিশাল প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। রাজ্য পুলিশ এবং সিআরপি জওয়ানরা এই মিছিল সামাল দিতে লাঠি চালায় এবং টিয়ার গ্যাসের শেল ফাটায়। মিছিলের পুরোভাগে মহিলারা ছিলেন। মিছিলে প্রায় সবার হাতে খাপখোলা কুকরি ছিল। কুকরির আঘাতে এক পুলিশকর্মী মারা যান এবং একজন ডিআইজি গুরুতর আহত হন। এরপর পুলিশ নাগাড়ে গুলি চালায়। সরকারি হিসেবে মৃত্যু হয়েছিল বারোজনের, তবে জিএনএলএফ-এর মতে মৃতের সংখ্যা আরও বেশি ছিল। এই ঘটনার পর পাহাড়ের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্য সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েন করে।

জিএনএলএফ-এর দাপট

সিপিএম-কে চাপে রাখতে কেন্দ্রীয় সরকার সুবাস ঘিসিংকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দিতে শুরু করে। এই ব্যাপারে তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বুটা সিংয়ের দিকেই জ্যোতিবাবুরা আঙুল তুলতেন। তখন রাজীব গািন্ধ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৮৭ সালে সুবাস ঘিসিং বিধানসভা নির্বাচন বয়কটের ডাক দেন। জ্যোতিবাবুদের প্রতি বেশি মাত্রায় ঝুঁকেছিলেন বলে দার্জিলিঙে রাজীব গািন্ধর জনসভাও ঘিসিং বয়কট করার ডাক দিয়েছিলেন। নর্থ পয়েন্ট ময়দানে রাজীবের সভায় শ্রোতা হিসেবে শুধু পুলিশ এবং সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যাওয়ায় কিছুদিনের মধ্যেই দার্জিলিঙে ফের রাজীবের জনসভার আয়োজন করা হল। প্রথমে ঠিক ছিল, রাজীবের জনসভা প্রদেশ কংগ্রেসের ব্যানারে হবে। তখন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন এবিএ গনি খান চৌধুরী। সভার আগের দিন সন্ধ্যায় ঘিসিং এই দাবিতে বেঁকে বসলেন যে, কংগ্রেসের ব্যানারে নয়, রাজীব সভা করবেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। ঘিসিংয়ের এই আচরণে রীতিমতো ক্ষিপ্ত হয়ে গনি খান ওই রাতেই শিলিগুড়ি নেমে আসেন। রাজীবের সেই সভায় অবশ্য বড় ধরনের জনসমাগম হয়েছিল। ওদিকে দার্জিলিং পরিস্থিতি সামাল দিতে রমেশ হান্ডাকে ডিআইজি পদে উন্নীত করে নিয়ে আসা হয়েছিল। এই অসমসাহসী হান্ডার ওপর আক্রমণ চালানো হয়। তিনি গুলিবিদ্ধ হলেও শেষমেশ প্রাণে বেঁচে যান।

শেষমেশ ডিজিএইচসি

অবশেষে সুবাস ঘিসিংয়ের ‘নাকের বদলে নরুন’ প্রাপ্তি হল। কেন্দ্র, রাজ্য এবং জিএনএলএফ-এর মধ্যে দফায় দফায় বৈঠকের পর ত্রিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী স্থির হল যে, পৃথক রাজ্য নয়, বরং ‘দার্জিলিং গোর্খা পার্বত্য পরিষদ’ (ডিজিএইচসি) গঠন করা হবে। ঘিসিং তার চেয়ারম্যান হলেন। কিন্তু পাহাড়ের মানুষকে ঘিসিং যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তা কোনওভাবেই বাস্তবায়িত হল না। এরপর আর পুলিশের গুলিতে নয়, বরং অবিশ্বাস এবং অনাস্থার কারণে নেতারা টার্গেট হতে শুরু করলেন। ঘিসিং নিজেও প্রচুর রক্ষীবেষ্টিত হয়ে চলাফেরা করতে লাগলেন।

একদিন সন্ধ্যায় শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যাওয়ার পথে কার্সিয়াংয়ে ঘিসিং আক্রান্ত হলেন। তিনি গুলিবিদ্ধ হলেও প্রাণে বেঁচে যান। পরবর্তীতে ঘিসিংকে হটিয়ে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের নেতৃত্বে আসীন হন তাঁরই একদা ঘনিষ্ঠ বিমল গুরুং। গুরুংয়ের নেতৃত্বে পাহাড় ফের উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই বনধ, গোলাগুলি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা আবার শুরু হয়। সাধারণ মানুষের বিপদ চরমে ওঠে। এবার গঠিত হল ‘গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ (জিটিএ)। আসল দাবি অর্থাৎ পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের স্বপ্ন আর মেটেনি। দার্জিলিং পার্বত্য এলাকা আজও পিছিয়ে রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের সমস্যা এখনও পাহাড়প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *